পাবনা, ৩১ অক্টোবর- জেলার আলোচিত ঈশ্বরদীর ফেইথ বাইবেল চার্চের ধর্মযাজক লুক সরকার নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি বিব্রতকর পরিস্থিতির এড়াতে সপরিবারে লাপাত্তা হয়েছেন।
বাড়ির মালিক মনিরুল ইসলাম যাজক লুক সরকারের চলে যাওয়ার বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে নিশ্চিত করেছেন।
জামাআতুল মোজাহেদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) কতিপয় দুর্বৃত্তের হামলার শিকার হয়ে প্রাণনাশের হাত থেকে বেঁচে গিয়ে তিনি নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নানা সংস্থার নজরদারি, জিজ্ঞাসাবাদে বিব্রতকর পরিস্থিতিতেই স্বপরিবারে এলাকা ছেড়েছেন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
বাড়ির মালিক মনিরুল ইসলাম শনিবার জানান, পাবনার ঈশ্বরদী বিমানবন্দর সড়কের তার বাড়ি থেকে লুক সরকার ২৭ অক্টোবর সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে আকস্মিকভাবে ট্রাকে করে বাসার আসবাবপত্রসহ মালামাল নিয়ে স্বপরিবারে বাসা ছেড়ে চলে গেছেন। কোথায় গেছেন, সে বিষয় তাকে কিছুই তিনি জানাননি। মনিরুল ইসলাম জানান, শুধু বলে গেছেন মোবাইল ফোনে আপনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হবে।
ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিমান কুমার দাশ শনিবার দুপুরে লুক সরকারের চলে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, বদলিজনিত কারণেই তিনি মূলত চলে গেছেন। এই চলে যাবার পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই বলে দাবি করেন ওসি বিমান।
ঈশ্বরদী ফেইথ বাইবেল চার্চের সুপারভাইজার ভানু বোস মুঠোফোনে জানান, লুক সরকার বদলিজনিত কারণেই এই চার্চ ছেড়ে গেছেন। তিনি কোন চার্চের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে সেটা আমি বলতে পারছি না। বর্তমানে ঈশ্বরদী চার্চে কোনো পালক নিয়োগ দেয়া হয়নি। আমিই দেখভাল করছি বলে তিনি দাবি করেছেন।
তবে একাধিক অসমর্থিত সূত্রে জানা গেছে, পাবনার ঈশ্বরদী থেকে লুক সরকার দক্ষিণাঞ্চলের খুলনাতে বদলি হয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, যশোরে বদলি হয়েছেন তিনি। মূলতঃ নিরাপত্তাজনিত কারণে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে যাচ্ছেন লুক সরকারের বিষয়ে।
উল্লেখ্য, পাবনার ঈশ্বরদীর বিমানবন্দর সড়কের স্কুলপাড়ার বাসায় চলতি মাসের ৫ অক্টোবর সকালে তিনজন দুর্বৃত্ত মোটরসাইকেলে ভাড়া বাসায় প্রবেশ করে ধর্মগ্রন্থ পাঠ শোনার কথা বলে ফেইথ বাইবেল চার্চের যাজক লুক সরকারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে। এ সময় তার চিৎকারে বাসার অন্যান্য সদস্য ও স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসতে থাকলে মোটরসাইকেল ফেলে রেখে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় লুক সরকার নিজেই বাদী হয়ে ঈশ্বরদী থানায় মামলা দায়ের করেন।
জেলা পুলিশ ও ঈশ্বরদী থানা সূত্রে জানা যায়, ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন শাখার সদস্যরা জেলাসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলার বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে ৭ জেএমবি সদস্যকে আটক করে। আটকের পর লুক সরকার সাংবাদিকদের বলেছিলেন যাদের ধরা হয়েছে তাদের অনেককেই তিনি চেনেন না। তবে মূল হামলাকারীদের আমি দেখলে চিনতে পারবো। এদিকে ঘটনার পর থেকে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনার তদন্তে এবং দোষীদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে খুবই তৎপর ছিল বলে জানা যায়। লুক সরকারের আকস্মিকভাবে চলে যাবার ঘটনায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এলাকায়।
পুলিশ জানায়, খ্রিস্টান ধর্মযাজক লুক সরকারকে গলা কেটে হত্যার পেছনে জেএমবি কানেকশন ছিল এমনটি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অভিযানে নামে। প্রথম দফায় ৭ জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায় জেএমবির আঞ্চলিক কমান্ডার রাকিবুল।
গত বুধবার সকালে পুলিশ জেএমবি’র আঞ্চলিক কমান্ডার রাকিবুলকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। তবে পরিবারের দাবি, শান্তি বজায় রাখতে ও আইনের প্রতি সন্মান এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই পুলিশের হাতে সোর্পদ করা হয়েছে রাকিবুলকে। এর আগে গ্রেপ্তারকৃত ৭ জেএমবিকে আদালত থেকে ৫ দিনের করে রিমাণ্ডে নেয় পুলিশ। গত বৃহস্পতিবার আদালতের মাধ্যমে ৫ দিনের রিমাণ্ডে নেয়া হয়েছে জেএমবির আঞ্চলিক কমান্ডার রাকিবুলকে।