টর্চার সেল মানে নির্যাতন কেন্দ্র। ’৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা নেত্রকোনার বেশ কয়েকটি সরকারী স্থাপনা ও বাসা-বাড়ি টর্চার সেলে পরিণত করে। মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বনকারী, নিরীহ বাঙালী ও নারীদের ধরে এনে এসব টর্চার সেলে অমানসিক নির্যাতন চালানো হয়। কেড়ে নেয়া হয় নারীদের সম্ভ্রম। প্রতি রাতেই এসব নির্যাতন কেন্দ্র থেকে শোনা গেছে যন্ত্রণাকাতর মানুষের আর্তনাদ। তবে এ তো ছিলো সেই আমলের কথা ২০১৯ সালে এসেও শোনা যাচ্ছে এমন টর্চার সেলের কাহিনি।
২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ’বাঙালি খান’ কাসেম আলী মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দড়িতে ঝুললেও তারই গড়ে তোলা বহুতল ভবনে ফের একটি টর্চার সেল খোলেন আরেকজন। তবে তিনি রাজাকার নন যুবলীগ নেতা। নাম একেএম মমিনুল হক সাঈদ।

তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মহানগর যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক। মতিঝিল-দিলকুশা এলাকায় ক্যাসিনো-জুয়ার আসর নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিতে অভিযুক্ত যুবলীগ নেতাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। একই দলের ভিন্নমতাবলম্বী ও তার অবৈধ কারবারের পথে কেউ কাঁটা হলে তাকে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে ধরে এনে তিনি নির্যাতন করতেন মতিঝিল ৮৯, আরামবাগের বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড (বিপিএল) ভবনের দোতলায় বানানো টর্চার সেলে। স্থানীয়দের কাছে ওই বিল্ডিংটি রাজাকার ভবন নামে পরিচিত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজাকার ভবনের ব্যবসায়ীরা জানান, মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর হলে বিপিএল ভবন দখল করে নেন ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। ৮তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একাংশে কার্যালয় খোলার পর অবশিষ্ট পুরো ভবনের ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকেও ভাড়ার টাকা আদায় করছেন তিনি।

গত ২৫ জুলাইয়ে ওই ভবনে চারজনকে নির্যাতনের অভিযোগ সাঈদের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ও মতিঝিল থানা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাসান উদ্দিন জামালের বিরুদ্ধে। তারা হলেন- রবিউল ইসলাম, রাকিব আহমেদ ভুঁইয়া, মোহাম্মদ অলি চৌধুরী ও রাজন হোসেন। তাদের প্রত্যেকের বয়স ১৮-২২ বছর। গোপীবাগ/মতিঝিলে বসবাসকারী তরুণরা নিজেদের ছাত্রলীগকর্মী দাবি করেছেন। তাদের নির্যাতনের পর মতিঝিল থানায় সোপর্দ করা হলেও পুলিশ ভুক্তভোগীদের কোনো ভাষ্য না নিয়েই জামাল উদ্দিনের কথামতো চারজনকে আটকের পর আদালতে সোপর্দ করে। গতকাল কথা হয় রবিউল ও রাকিবের সঙ্গে।

লোমহর্ষক সেই ঘটনার বর্ণনায় রবিউল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, ২৫ জুলাই রাত ১২টার দিকে তারা অলি চৌধুরী ছাড়া অপর তিনজন গোপীবাগ রেললাইন এলাকায় আড্ডা দিচ্ছিলেন। ওই সময় একটি মাইক্রোবাস এসে তাদের সামনে থামে। গাড়ি থেকে ৮-৯ জন নেমে নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয় দেন। এর পর ওই গাড়ি করেই টানাহেঁচড়া করে তাদের তুলে নেয়। গাড়িতে উঠে তারা দেখতে পান ভেতরে জামালউদ্দিনসহ আর কয়েকজন।

পাশাপাশি অলি চৌধুরীকে মিথ্যা ফোন দিয়ে বাসা থেকে ডেকে আনা হয়। পরে তাদের নেওয়া হয় আরামবাগের রাজাকার ভবনে। সেখানকার দোতলায় থাকা কাউন্সিলর সাঈদের রাজনৈতিক কার্যালয় রবিউল আগেই চিনতেন। আর সাঈদের কার্যালয়ে পেছনের একটি কক্ষের ফ্লোরে বসানো হয়। একেক করে সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তারা মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক মিরাজ বিশ্বাসের লোক কিনা।

রবিউল বলেন, মিরাজ ভাইয়ের কর্মী স্বীকার করতেই ফাইবারের লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো শুরু করেন যুবলীগের জামাল, নাইন ইকবাল, মিজানুর রহমান রানা, রিপন হাসান, থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল হোসেন আকাশ। সারারাত তাদের চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে (চেয়ার থেরাপি), মুরগির মতো হাঁটুভাঙার স্টাইলে দাঁড় করিয়ে (হাঁটু থেরাপি) দেন সাঈদ বাহিনীর জামাল-আকাশরা। এ ছাড়া গিরায় গিরায়, হাত-পায়ের তালুতে পেটানো হয়।

এনার্জি সেভিং লাইট সংযোজন কারখানার কর্মী পরিচয় দেওয়া রবিউল বলেন, আমরা চার বন্ধু মিরাজ ভাইয়ের হয়ে ছাত্রলীগ করতাম। তার হয়ে দলীয় কর্মসূচিতে যেতাম। মিছিল করতাম। কিন্তু মিরাজ ভাই সাঈদ গ্রুপের বাইরে। কাউন্সিলর সাঈদ এটি পছন্দ করত না যে, এলাকায় তার কোনো প্রতিপক্ষ থাকুক। মূলত এ জন্য জামাল-আকাশ-ইকবালকে দিয়ে আমাদের শায়েস্তা করা হয়।

রবিউলের মতো রাকিব আহমেদ ভুঁইয়া বলেন, ছাত্রলীগ করেও সারারাত যুবলীগ-ছাত্রলীগের হাতে মার খেয়েছি তাতে দুঃখ নেই। কিন্তু ভোরে আবার ওরাই মতিঝিল থানার এসআই সুজনকে ডাকে। তিনি সাঈদের টর্চার সেলে এসে পাশের একটি রুমে জামালের সঙ্গে কী নিয়ে যেন আলাপ করে। এর পর আমাদের ভাষ্য ছাড়াই আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। মতিঝিল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

রাকিবের বক্তব্য সারাদিন পিটুনির কারণে হাঁটতে পারিনি। কিন্তু এসআই সুজন তাতে ভ্রুক্ষেপ করেননি। কোরবানির চার দিন আগে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে মুক্তি পান তারা। অলি চৌধুরীর স্বজনদের বক্তব্য সাঈদের কার্যালয়ে নির্যাতনের পর সাঈদকে ফোন করা হলেও তিনি কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেননি।

মতিঝিল থানার এসআই সুজন চন্দ্র রায় স্বাক্ষরিত জিডিতে বলা হয়, ২৬ জুলাই ভোরে কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদের নামে মিথ্যা, কুৎসা ও অপপ্রচারমূলক বিভিন্ন দেয়ালে পোস্টার লাগানোর সময় স্থানীয়রা তাদের আটক করে। তাদের কাছ থেকে অপপ্রচারের পোস্টার জব্দ করা হয়েছে।

তবে সুজন চন্দ্র রায় এ প্রতিবেদককে বলেন, রাতে চার ছেলেকে নির্যাতন করা হয়েছে, এ ধরনের তথ্য আমি পাইনি। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদেও তারা নির্যাতনের কথা বলেনি। কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে অপপ্রচারমূলক পোস্টারসহ তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দিলকুশার আরামবাগ ক্রীড়াচক্র এবং দিলকুশা ক্লাবের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া সড়কের মুখেই রাজাকার ভবনের অবস্থান। আর ওই দুটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন সাঈদ। সরেজমিন সোমবার রাজাকার ভবনে ঢুকতেই দেখা গেছে, নিচতলায় ছাত্রলীগের লোগোসংবলিত অনেকগুলো মোটরসাইকেলে। ভবনের দোতলায় উঠতেই সিঁড়ি সামনে মমিনুল হক সাঈদের ব্যানারসংবলিত রাজনৈতিক কার্যালয় নামধারী টর্চার সেল। তার সামনের গেটে পাহারায় রয়েছেন ৩-৪ যুবক।

ওই ভবনে থাকা একাধিক প্রিন্টিং ব্যবসায়ী জানান, ক্যাসিনো-জুয়ার আসরে অভিযান চালানোর আগেই বিদেশ চলে যান কাউন্সিলর সাঈদ। এর আগে নিয়মিত সেখানে অফিস করতেন তিনি। মতিঝিল ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা ভিড় জমাতেন সেখানে। সন্ধ্যার পর সাঈদ ওই ভবনে ঢোকামাত্রই দলীয় ক্যাডাররা বাইরে-ভেতরে পাহারা বসাতো। প্রিন্টিং ব্যবসার দোকানে কেউ এলেও তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া হতো। রাতে ব্যবসায়ীরা চলে যেতেন।

বিপিএল ভবনের ৫ তলার ওপরের আবাসিক ভাড়াটিয়াদের দুজন জানান, গভীর রাত পর্যন্ত সাঈদের কার্যালয়ে লোকজন থাকত। সেখানে নারীদের যাতায়াত ছিল। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ কিংবা ভাগবাটোয়ারায় অমিল হলে যে কাউকে ধরে আনা হতো ওই টর্চার সেলে। তবে কাচঘেরা হওয়ায় কার্যালয়ের বাইরে শব্দ আসেনি।

আবাসিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভাড়াটিয়াদের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের আগে তার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের প্যাডে ভাড়া দিতেন তারা। কিন্তু কাসেম আলী ফাঁসিতে ঝোলার পর হঠাৎ একদিন ভবনের দোতলার একাংশ দখল করে নেন কাউন্সিলর সাঈদ। রাতারাতি সেখানে রাজনৈতিক কার্যালয় গড়ে তোলেন। পরে পুরো ভবনটির ভাড়া তোলা শুরু করেন সাঈদের ক্যাডাররা।

৮ তলা ভবনটি প্রতিটি ফ্লোরে দুই রুমের ১২টি অফিস স্পেস রয়েছে। একেকটি অফিসের মাসিক ভাড়া ১০ হাজার ৬০০ টাকা। ভাড়ায় কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম না থাকলেও নিচে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নামে একজনের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে ওই ভবনে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনরত কাউকে পাওয়া যায়নি। নিচতলায় কর্তব্যরত নিরাপত্তা প্রহরী উল্টো এ প্রতিবেদকের পরিচয় জানতে চান। তিনি বলেন, ’কারা ভাড়া তোলে, সেটি আমিও জানি না।’

ভবনের তৃতীয় তলায় কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমানের সঙ্গে। অ্যারিস্টো আর্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। মিজানুর রহমান বলেন, ৬-৭ বছর আগে বাংলাদেশ পাবলিকেশন্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। এ সময়ে ভাড়া না বাড়লেও ভাড়া আদায়কারী বদলে গেছে। তবে তারা কারা সেই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই।

মতিঝিলের ছাত্রলীগ-যুবলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বাসিন্দা মমিনুল হক সাঈদ। পারিবারিক ঝামেলায় ২০০২ সালে তিনি ঢাকায় এসে মতিঝিলের দিলকুশা সাধারণ বীমা করপোরেশনের সামনের সড়কে পুলিশকে ম্যানেজ করে চোরাই তেলের ব্যবসা করতেন। থাকতেন বঙ্গভবনের চার নম্বর গেটের কোয়ার্টারে। সেখানে তার মামা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর চাকরি করতেন।

পরে মোহামেডান ক্লাবের তৎকালীন নেতা আলমগীর ও তাপসকে ম্যানেজ করে ওই ক্লাবে হাউজি চালাতেন সাঈদ। ২০০৭ সালের দিকে যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রভাবশালী নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্যের সুনজরে ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি হন তিনি। ওই নেতার সিদ্ধেশ্বরীর বাসায় বাজার করে দিতেন কাউন্সিলর সাঈদ। আর নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় একসময় যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক পদও বাগিয়ে নেন তিনি। এর পর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতির পদ ছেড়ে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় হাসান উদ্দিন জামালকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মূলত জামালের মাধ্যমেই আরামবাগ ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব, ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো-জুয়ার আসর বসাতেন সাঈদ। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ভবনে টেন্ডারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে জামালের পাশাপাশি কামরুল হাসান রিপন ছিল সাঈদের অংশীদার। বিআইডব্লিউটিএর ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রিপনের বাড়ি চাঁদপুরে। জামালের বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে।

প্রসঙ্গত, এর আগে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার ভয়ঙ্কর এক টর্চার সেলের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব-৩। গত বুধবার গভীর রাতে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশনের উল্টো দিকে ইস্টার্ন কমলাপুর টাওয়ারে খালেদের এই টর্চার সেলের সন্ধান পায় র‌্যাব-৩ এর একটি দল। কেউ চাঁদা দিতে না করলেই টর্চার সেলে নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হতো। উচ্চ মাত্রায় সুদসহ পাওনা টাকা আদায়সহ সব ধরনের কাজে ব্যবহার করা হতো এই টর্চার সেল। টর্চার সেলে নির্যাতনের অনেক ধরনের যন্ত্রপাতি রয়েছে।