স্কুল জীবনের অধ্যায়টা সকল মানুষের কাছে সবথেকে প্রিয় আর স্মৃতিময় হয়ে থাকে সারা জীবন। আর সেই স্কুল জীবনে শিক্ষকরা প্রতিটা ক্ষেত্রে অনেক বড় অবদান রাখেন। তবে প্রতিটা ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে স্কুলে ভয়ের একটি নাম থাকে সেটি হচ্ছে স্কুলের প্রধান শিক্ষক। স্বভাবতই আমরা স্কুলের প্রধান শিক্ষকে বেশ ভয়ের নজরে দেখতাম।
প্রধান শিক্ষকের নাম মাথায় আসলেই মনে ভেসে আসতো রাগী গম্বীর প্রকৃতির একজন মানুষের চেহারা। তবে এবার পাওয়া গেলো এমন একজন প্রধান শিক্ষকের সংবাদ যাকে দেখলে বা তার নাম শুনলে শিক্ষার্থীদের মনে ভেসে ওঠে মমতাময়ী মায়ের চেহারা।বলছিলাম বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নাছিমা বেগমের কথা।

সম্প্রতি নাছিমা আক্তারের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় আপনার কতজন সন্তান। এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি হাসলেন। নাছিমা আক্তার বলেন, সঠিক সংখ্যাটা বলা কঠিন। অজস্র সন্তান আমার। দীর্ঘ শিক্ষকতার জীবনে সব শিক্ষার্থীকেই আমি সন্তান ভেবেছি। কাজেই আমি নিজেকে অজস্র সন্তানের মা মনে করি। শিক্ষার্থীরা আমাকে কতটুকু মা ভাবে সেটা আমি বলতে পারব না।

২০১৫ সালে নাছিমা আক্তার বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে প্রধান শিক্ষক হিসেবে ছিলেন জামালপুর জিলা স্কুলে। এ দুটি বিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী তাকে মা বলে ডাকে। নাছিমা আক্তারও শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মত দেখেন। তিনি অনেক শিক্ষার্থীকে সন্তানের মত স্নেহ দিয়ে নিজের কাছে রেখে পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছেন। নিজের বেতনের টাকা দিয়ে আটজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন। এসব শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, এইচএসসি, এসএসসি ও স্কুলপর্যায়ে পড়াশোনা করছে। আবার অনেকে তার সহায়তায় শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছে। এখনও স্কুল-কলেজের তিন ছাত্রীকে নিজের সঙ্গে রেখে পড়াশোনা করাচ্ছেন।

এসব বিষয় এখন ময়মনসিংহ আর জামালপুরের মানুষের মুখে মুখে। নাছিমা আক্তার শিক্ষকতায় অবদানের জন্য ২০১৬ সালে বিভাগীয় পর্যায়ে ও ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে জাতীয় পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মাননা পেয়েছেন।

নাছিমা আক্তার জানান, শিক্ষা জীবনের শুরু থেকেই তিনি শিক্ষকদের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তার এতটুকু বড় হয়ে ওঠার পেছনের সব অবদান শিক্ষকদের। ছোট বয়স থেকেই তিনি শিক্ষকদের আঙুল ধরে হেঁটেছেন। স্কুলে আর কলেজে পড়ার সময় টিফিন পিরিয়ডে সহপাঠীরা যখন মাঠে খেলত, তখন তিনি স্কুলের শিক্ষক মিলনায়তনের সামনে ঘুর ঘুর করতেন। যদি কোনো প্রয়োজনে কোনো শিক্ষক ডাকেন এ আশায়।

স্কুলে তখন নলকূপ ছিল না। মাঝে মাঝে পানি আনার প্রয়োজন হলে বারান্দায় ঘুর ঘুর করা মেয়েটির ডাক পড়ত। শিক্ষাজীবনে তিনি সব শিক্ষকের প্রিয় ছাত্রী হতে পেরেছিলেন। সেই সব প্রিয় শিক্ষকরাই তার জীবন গড়ে দিয়েছেন। তার জীবনে প্রিয় শিক্ষক রয়েছেন অনেকে। তবে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে প্রিয় প্রদীপ স্যারের কথা।

নাছিমা আক্তারের জন্ম জামালপুর জেলা সদরের শ্রীপুর কুমারিয়া ইউনিয়নের মাটিখোলা গ্রামে। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ। বাবা আব্দুল হাই ছিলেন সরকারি কর্মচারী। সংসারে অভাব ছিল। সেই অভাবের মধ্যেই তিনি বেড়ে ওঠেন। জামালপুর সদরের বানিয়া বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সিংহজানি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুল শেষ করেন। পরে জামালপুরের সরকারি জাহিদ সফির মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু পরিবারের অর্থ সংকটের কারণে সেটা হয়নি। স্নাতক পাস করার পর ১৯৯০ সালে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহনের জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জামালপুর থেকে ভোর ৪টায় যে ট্রেন ঢাকার উদ্দেশ্যে যেত, সুযোগ পেলে সেই ট্রেনে চেপে বসতেন। এরপর কমলাপুর স্টেশনে নেমে রিকশায় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আবার ঢাকা থেকে সন্ধ্যার ট্রেন ধরে জামালপুর। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যেত। পর দিন আবারও স্কুলের শিক্ষকতা। এভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। এরই মধ্যে পেরিয়ে যায় সাতটি বছর। ১৯৯৭ সালে তিনি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান। প্রথম কর্মস্থল ছিল জামালপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ২০০১ সালে ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে বদলি হন। পরে জামালপুর জিলা স্কুলেও প্রধান শিক্ষক হিসাবে কাজ করেন। ২০১৫ সালে পদোন্নতি পেয়ে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন।

নাছিমা আক্তার বলেন, ছোটবেলায় খুব উদাসীন ছিলাম। বড় হয়ে কি হতে হবে সে বিষয়ে কখনো ভাবিনি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় স্কুলের পেছনে ছিল ব্রহ্মপুত্র নদ। সেই নদের পাড়ের মানুষগুলো ছিল খুব দরিদ্র। একবার ওই গ্রামের মনু নামের এক শিশু শিক্ষার্থী মারা যায়। সে শোকে গ্রামের নারীরা খুব কাঁদছিল। আমি কিছু না বুঝেই ওই নারীদের পাশে বসে কাঁদতে শুরু করি। কাঁদতে কাঁদতে সেদিন আমি স্কুলের পরীক্ষা মিস করেছিলাম। ছোট বেলা থেকেই মানুষের কষ্ট আমাকে খুব কষ্ট দিত। বড় হওয়ার পরও মানুষের কষ্টে আমিও কষ্ট পাই।

তিনি বলেন, আমি স্কুলের সকল শিক্ষার্থীকে নিজের সন্তান মনে করি। কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে তার বাবা-মা কখন আসবে পরে চিকিৎসা হবে সেই চিন্তা না করে নিজেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। কোনো শিক্ষার্থী অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পারলে সাধ্যমত তার পাশে দাঁড়াই। বিনিময়ে শত শত শিক্ষার্থী আমাকে মা ডাকে। এটাই তো সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমি জীবনের অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত। যখন আমি বাচ্চাদের সান্নিধ্যে আসি তখন পেছনের সব কিছু ভুলে যাই।


প্রসঙ্গত, নাছিমা আক্তার শুধু যে মা হিসেবেই পরিচিত তা নয়। নিজের বেতনের অংশ থেকে ৮ জন শিক্ষার্থীর খরচ তিনি চালান। তাদের যাবতীয় পড়া-শুনার খরচ বহন করে তাদের শিক্ষার সকল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তিনি। তার এমন মহানুভবতা দেখে মানুষ মুগ্ধ। সকল শিক্ষার্থীদের অভিবাকরা অনেক শ্রধা করে থাকেন তাকে। তবে নাছিমা আক্তার অনেক সময় কিছু বিতর্কিত কর্ম কান্ডের জন্য সমালোচিতও হয়েছিলেন।