বাংলাদেশের সিম কোম্পানিগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সব থেকে বড় কোম্পানির নাম হচ্ছে গ্রামীণফোন। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণফোন বাংলাদেশের বাজারে ব্যবসা করে আসছে। এবং তাদের গ্রাহক সংখ্যা ও অন্যান্য কোম্পানিগুলো থেকে অনেক বেশি। জনপ্রিয়তার দিক থেকে আছে তারা অনন্য উচ্চতায়। তবে তাদের নামে সমালোচনারও শেষ নেই। বিশেষ করে সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়াতে গ্রামীণফোন সবথেকে বেশি সমালোচিত হয়ে থাকে। আর তাই গ্রামীণফোনকে নিয়ে নড়েচড়ে বসেছিল বিটিআরসি। তাদের কাছে পাওনা টাকা আদায় করতে আদালত পর্যন্ত যেতে হয়েছে বিটিআরসিতে। সম্প্রতি পাওনা টাকার মধ্যে ১০০ কোটি টাকা ফেরত দিল তা নিতে অনীহা দেখেছি বিটিআরসি।


নিরীক্ষা দাবির বকেয়া পাওনার প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে গ্রামীণফোনের (জিপি) ১০০ কোটি টাকা পরিশোধের চেক ফেরত দিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি।

এ ব্যাপারে বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) জাকির হোসেন খান সমকালকে বলেন, গ্রামীণফোনের নিরীক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে মহামান্য আদালতের একটি নির্দেশনা রয়েছে। এ কারণে বিটিআরসি ওই নির্দেশনার বাইরে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না। কমিশন আদালতের নির্দেশনা প্রতিপালনে সচেষ্ট রয়েছে।

বিটিআরসির নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্রামীণফোনের কাছে বকেয়া পাওনার পরিমাণ ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এই পাওনা দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণফোন আদালতে গেলে সর্বশেষ গত বছরের ২৪ নভেম্বর আপিল বিভাগ তিন মাসের মধ্যে গ্রামীণফোনকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেয়। তবে গ্রামীণফোন সেই অর্থ পরিশোধ না করে গত ২৬ জানুয়ারি দুই হাজার কোটি টাকার পরিবর্তে ৫৭৫ কোটি টাকা দেওয়ার আবেদন জানিয়ে সর্বোচ্চ আদালতে রিভিউ পিটিশন দাখিল করে। বৃহস্পতিবার সেই রিভিউ পিটিশনের ওপর শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে এই শুনানির আগের দিন গ্রামীণফোনের কয়েক কর্মকর্তা ১০০ কোটি টাকার একটি চেক নিয়ে বিটিআরসিতে যান। গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে ওই ১০০ কোটি টাকা গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তা প্রত্যাখ্যান করে বিটিআরসি। এ ব্যাপারে বিটিআরসি সূত্র জানায়, গ্রামীণফোনের এ ধরনের পদক্ষেপ বোধগম্য নয়। এর আগে অন্য অপারেটর রবির বকেয়া পাওনা পরিশোধে আদালত টাকার পরিমাণ ও সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। রবি আদালতের নির্দেশ প্রতিপালন করেছে। প্রত্যাশা ছিল গ্রামীণফোনও রবির মতো আদালতের নির্দেশ প্রতিপালন করবে। তারা পরবর্তী সময়ে রিভিউ পিটিশন করেছে, সেটিও তারা করতে পারে। কিন্তু রিভিউ পিটিশনের শুনানির আগের দিন এভাবে ১০০ কোটি টাকার চেক নিয়ে এসে বকেয়া পাওনা পরিশোধ করার প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ব্যাপারে বুধবার বিকেলে গ্রামীণফোনের পরিচালক ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্সের প্রধান হোসেন সাদাত জরুরি ভিত্তিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, বিরোধপূর্ণ অডিটের স্বচ্ছ ও গঠনমূলক সমাধানে টাকা জমা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বিটিআরসিকে আলোচনার আমন্ত্রণ জানিয়েছে গ্রামীণফোন। সমাধান প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে বুধবার গ্রামীণফোন বিটিআরসিতে ১০০ কোটি টাকা জমা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। গ্রামীণফোন আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করেছিল এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিটিআরসি গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি ফ্রেমওয়ার্ক ও পদ্ধতিতে সম্মত হবে। তবে বিটিআরসি এ প্রস্তাবনায় সম্মত হয়নি।

তিনি আরও বলেন, গ্রামীণফোনের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো অডিট দাবির যথার্থতা বিবেচনায় এনে একটি সমাধানে পৌঁছানো, যেটি চলমান আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে বিকল্প একটি উদ্যোগ। কারণ যাত্রার শুরু থেকে গ্রামীণফোন সঠিক সময়ে বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং দক্ষ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে সাত কোটি ৬৫ লাখ গ্রাহককে সেবা দিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত সরকারি কোষাগারে ৭৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা দিয়েছে। অতএব বাংলাদেশের আর্থ-সামজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে গ্রামীণফোন তার স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।


প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মোবাইল ফোনের গোড়াপত্তনের শুরুর দিকের কোম্পানি গ্রামীণফোন। বলতে গেলে বাংলাদেশের নেটওয়ার্কিং সিস্টেম নিয়ে এসেছে এই কোম্পানিটিই‌। আর তাই স্বভাবতভাবেই তাদের গ্রাহক সংখ্যা অনেক বেশি। এবং গ্রামীনফোন ভালো সেবা দিয়ে থাকে তাদের গ্রাহকদের। তবে তাদের নামে কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন থেকে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রামীণফোনকে খুব দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে এই বিষয়টি। অন্যথায় তারা কঠোর পদক্ষেপ নেবেন বলে জানিয়েছেন।