বাংলার শিল্পী বাঙালীর শিল্পী এন্ড্রু কিশোর। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন শিল্পীর জন্ম বোধ হয় আর হবে না। তার ভরাট কন্ঠ আর দরাজ কন্ঠ দিয়ে পাগল করে দিয়েছিলেন পুরো বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ সহ বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে। সব ছেড়ে সবাইকে কাদিঁয়ে গতকাল চলে গেলেন তিনি। আকাশ বাতাস কাঁদিয়ে সেসব কণ্ঠস্বরের সুরসুধা বাংলাদেশকে আমোদিত, বিমোহিত, আনন্দিত, আবেগাপ্লুত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু বাংলাদেশের বিশাল এবং প্রধানতম বিনোদনের জায়গা সিনেমা হল। সেখানে যারা ছবি তৈরি করেন, ছবির জন্য ভালোবেসে টাকা ঢালেন, চিত্রকল্প লেখেন, অভিনয় করেন, গান করেন, হাসেন-কাঁদেন, তারা এবং তাদের জীবন, তাদের উপস্থাপন, তাদের শক্তি- সবকিছুই ’লার্জার দেন লাইফ’ হয়ে থাকে এবং হতে হয়।
প্রকৃতিতে আলহামদুলিল্লাহ অনেক কণ্ঠই ভেসে ভেসে আসে।
সেই পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ৩৫ মিলিমিটারের জন্য ফুলস্কেপে পুরো স্ক্রিনে গান ভাসিয়ে দেওয়া ’লার্জার দ্যান লাইফ’ নামক শক্তির চেয়েও বেশি শক্তির অধিকারী হতে হয়। ব্যাপারটা বোঝার জন্য একটু কঠিন হয়ে গেলো কি? আমি দুঃখিত এরচেয়ে সহজ করে আমি বোঝাতে পারছি না।

আমাদের দেশে কণ্ঠশিল্পী আছেন কতজন আর ’বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা’র এযাবৎকালের ইতিহাসে রেগুলোর প্লেব্যাক সিংগার আছেন কজন? এর উত্তর কারো জানা আছে? এই প্রশ্ন কারো মাথায় এসেছে? মঞ্চ মাতানো আর প্লেব্যাক যোজন যোজন দূর।

প্লেব্যাক সিংগার আছেন হাতে গোনা কজন। কারণ অন্যান্য গান গাওয়া যায়, কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ৩৫ মিলিমিটারের জন্য গান গাওয়া খুব কঠিন।

হলে স্ক্রিন ভরে পুরো গান ছড়িয়ে গেলে সে গান হলের ভেতর সর্বজনীন হয়ে ওঠে। গানের ওয়েভ মাপারও যন্ত্র আছে। আছে কোয়ার্টার থ্রোট হাফ থ্রোট ফুল থ্রোটের গ্রামার। ফিল্মে একমাত্র যাদের ফুল থ্রোট ওয়ালা কণ্ঠ আছে তাদের কণ্ঠই কাজে লাগে। কিন্তু সেই কণ্ঠকে পানির মতো বইয়ে দিতে হয়। সেটা বড় কঠিন কাজ আর এই কঠিন কাজ পানির মতো সহজ করে সফলতার সঙ্গে উপস্থাপন করে নিজেকে বাঘের মতো শক্তিশালী হিসেবে যিনি পরিচিত করতে পেরেছেন, তিনি আমাদের কণ্ঠরাজ এন্ড্রু কিশোর।

আমি তার কণ্ঠকে বলি গলিত সোনা। সোনার চলমান ধারা। তার সঙ্গে পরিচয়ের আগেই আমি তার গান শুনি। ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে এএএএ। হেসে-খেলে, তাচ্ছিল্য ভরে কেউ দুঃখ কইতে পারে- এ কথা আমি আগে জানতামই না। দয়াল ডাকছে, আমি মরে যাবো- এ গানতো বাংলাদেশিরা ফিচফিচ করে কেঁদে কেঁদে গায়! এতো দুঃখের অনুভূতি এমন হেসে-খেলে আসল ভাব বজায় রেখে গাইলেন আমাদের কিশোরদা। সেই থেকে শুরু। আমি আব্দুল আলীম থেকে একেবারে কিশোরদাতে স্থানান্তরিত হলাম। সে হয়তো ’৮০/’৮১-এর কথা।

এর পর ’৮৬ সালে জীবনসঙ্গী সুরকার সংগীত পরিচালক মইনুল ইসলাম খান সাহেবের ছবির গানের রেকর্ডে ওনাকে আমি সামনাসামনি দেখলাম। কিন্তু মনে হলো কতদিনের চেনা। হাতে একটা অফিসিয়াল ব্যাগ। সেখান থেকে কাগজ-কলম বের করে গান লিখে নিলেন! গান তোলার সময় কলমের হেড ঠোঁটের সঙ্গে কিপ করার মতো একটা ভঙ্গি করে গান তুলে নিলেন এক মুহূর্তেই। এর পর ইতিহাস! প্রতিটি গানই তার ইতিহাস। অথচ তিনি বলতেন আমি তো আম জনতার শিল্পী। ভদ্রলোকরা আমার গান শোনেন?প্রথম আলো মেরিল পুরস্কার প্রথমবার পাওয়ার পর বারবার বলছিলেন কি আশ্চর্য, আমার গান ভদ্রলোকের বেডরুমে যায়! অথচ সারা বাংলা সারা পৃথিবী গানের জন্য প্রদক্ষিণ করার সময় নিউইয়র্কে ডাক্তার দের জন্য গান গেয়ে ইন্টারভেলে ব্যাকস্টেইজে একদল ডাক্তার এসে যখন বললেন কিশোর দা, আপনি গান শুনে শুনে আমরা ডাক্তার হয়েছি। কিশোরদা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে চোখ সরু করে শুধান ’সে কেমন?’ তাদের উত্তর ছিলো যখন মানবদেহের হাড্ডি গুড্ডি আমাদের আঁকড়ে ধরতো মাথা কাজ করতো না তখন এন্ড্রু কিশোর ছেড়ে মাথা ঠাণ্ডা করতাম। তারপর সেটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেলো। কিশোরদার হাতের সিগারেট পুড়ে ছাই। আমি বললাম এবার বুঝলেন তো! তিনি শিশুর সরলতায় ফ্যালফ্যাল হাসেন। বাঘের মুখে শিশুর হাসি বড়ই সুন্দর!

কত গান যে গাইলাম তার সঙ্গে! পৃথিবীর সব কিছুই যেন তার নখদর্পণে। কিন্তু কোনো কিছুতেই তার কিছু আসে যায় না। জীবনে কোনো সমস্যাই তার কাছে সমস্যা নয়, এক মুহূর্তেই সমাধানও দিয়ে দেবেন চোখ বুঁজে!

খেতে এতো ভালোবাসতেন কিশোরদা! একাই তিনজনের খাবার সাবাড় করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতেই আবারও খিদা লাগাতে পারতেন! বলতেন জানো কনক আমার হলো ইচ্ছেখিদে। ইচ্ছে হলেই খেতে পারি। খুব আমুদে মানুষ তিনি কিন্তু ভীষণ প্রফেশনাল কিশোরদা। মীরপুর থেকে প্রায় রোজ শ্রুতি স্টুডিওতে সময়মত চারটি খানি কথা না!

এই শক্তিশালী মানুষটিকে আমি কাঁদতেও দেখেছি জনসমক্ষে। রাজশাহীতে তার ওস্তাদজির অসুস্থতায় আমরা কজন যখন বিনাপারিশ্রমিকে গাইতে গেছি, তখন তিনি মঞ্চে কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন! সে কান্না মঞ্চের পেছনেও শেষ হয় না। নীরবে নীরবে অনেক দান-ধ্যান করেন কিশোরদা। কিন্তু কাউকে টের পেতে দেন না! আমাদের মিলু ভাই চলে যাওয়ার পর দীর্ঘদিন আসিফ এবং কিশোরদা মিলে মিলু ভাইয়ের পরিবারের পাশে নিরবে দাঁড়িয়েছিলেন যা আমাদের জানতে দেন নাই।

নিজের রাজশাহীর মানুষের প্রতি অসম্ভব পক্ষপাত ছিলো, তাদের সুখ দুঃখ আর্থিক অভাব অনটন সব জানতেন খোঁজ নিতেন এবং যথাযথ ব্যাবস্থা করতেন নিরবে।

আমাকে কিশোরদা অসম্ভব স্নেহ করতেন, যার কোনো তুলনা হয় না। আমার রান্না তাঁর খুব পছন্দ আর খেতে তিনি খুব ভালোবাসেন আগেই বলেছি। আমার স্বামী তার বয়সে কিছু ছোট। কিন্তু এমন স্নেহভরা কণ্ঠে তিনি ’ও মইনুল’ বলে ডাক দেন যে, আমার বুকটা ভরে ওঠে অসম্ভব ভালোলাগায়। সুরকার মইনুল ইসলাম খান সাহেব সাউন্ডটেকের একটি ক্যাসেট করেছিলেন ’দুখের সানাই’। তখন কিশোর দা ক্যাসেটের একটা গানে লাখের উপর পেমেন্ট নেন। তো গাওয়ার আগে বললেন মইনুল তোমার গান যে কঠিন, আমি পারবো? এমন উদ্ভট কথা বলে তিনি অপূর্ব গেয়ে দিলেন। সম্মানীর কথায় বললেন ’মইনুল, সাউন্ডটেকের কাজ না কিসের কাজ আমি জানিনা, আমি তোমার গান গেয়েছি। আমাকে দিয়ে কেউ তেমন অন্য ধারায় এক্সপেরিমেন্ট করেনি। তুমি করলে এতেই আমি খুশি। আমি নিজেকে ঝালিয়ে দেখলাম। আমি কোন পয়সা নেবোনা। এই নিয়ে দুজনের ধস্তাধস্তি পর্যন্ত হলো, খান সাহেব সেই সম্মানী নেওয়াতেই পারলেন না।’

কিশোরদার সঙ্গে ছবিতে যেমন হাজার হাজার গান গেয়েছি তেমন শতশত মঞ্চেও গেয়েছি একসঙ্গে। খুবই মজার বিষয়- কিশোরদা ভাবেন উনি মঞ্চের শিল্পী নন। একটু অস্বস্তিও তার টের পেয়েছি; কিন্তু ঘটনা হলো- তাঁর সুন্দর মার্জিত ড্রেসআপে তিনি যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে ’আমার সারা দেহ খেও গো মাটি ওওওওওও’ বলে টান দিতেন, তখন মনে হতো লম্বা একটা লোক অসম্ভব জাদুশক্তি-বলে একটানে লম্বা একটা তালগাছকে টেনে মট করে গোড়া উপড়ে ধরায় নামিয়ে আনলেন! এটা লিখতে গিয়েও আমার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল। আমি প্রতিটি মঞ্চের পেছনে হা করে বসে তাঁর গান শুনতাম। মঞ্চের হাজার পাওয়ারের আলো ম্লান হয়ে যেতো তাঁর উপস্থিতির কাছে। ’ওরে এই না ভুবন ছাড়তে হবে দুদিন আগে পরে’ গাইতেন যখন তখন আমি অঝোরে কাঁদতাম। এটা আমার রেগুলার রুটিন ছিলো! এছাড়া আমি পারতামই না!

আমি আর কিশোরদা যখন একই বুথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে প্লেব্যাক করতাম, তখন আমাদের ভীষণ হেলদি একটা প্রতিযোগিতা চলত- কে কতটা ভালো গাইতে পারি। ফার্স্ট হওয়ার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও একজন আরেকজনকে খাতা দেখানোর মতো কাণ্ড করতাম। আমি হয়তো জিজ্ঞেস করলাম- কিশোরদা এই জায়গাটা কেমনে কী? উনি হেসে দিয়ে বলতেন- তুমিই দেখাও। যেন আমি তার খাতা দেখে নিচ্ছি। অনেক সময় দেখা গেল গলা বসা। ঢকঢক গরম পানি চলছে, আমি তাঁর জন্য চিন্তা করছি; কিন্তু গাইতে গিয়ে সেই গলিত সোনার প্রবাহ। আহা! আমি আর লিখতে পারছিনা।

গত সেপ্টেম্বর এগারো তারিখ। আমার পঞ্চাশতম জন্মদিন! অথচ আমি পরিবার ছেড়ে নিউইয়র্কে ভাগ্নীর বাসায়। জাহাঙ্গীর ভাই জানালেন দাদা অসুস্থ। সিংগাপুর চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া টাকা নিয়ে নিন্দুকেরা ঝড় তুলেছে। আমি ভাইবারে কিশোরদার শারীরিক অবস্থা জেনে তারপর বললাম কিশোরদা এই অবস্থা, আমি প্রতিবাদ করতে চাই, কি বলেন। উনি বরাবরের মতো ঠাণ্ডা মাথায় বললেন শোন, আমি তো আর অভদ্র বেয়াদব না! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডেকেছেন, আমাকে তো যেতেই হবে। আগ বাড়িয়ে কিছু বলার দরকার নেই। কেউ বেশি আজেবাজে কথা বললে তখন তুমি তোমার মতো করে উত্তর দিও। নয়মাস চিকিৎসা করার পরে যখন বিফল মনোরথ হয়ে ফেরত আসছেন সেই সময় ও তাঁর সাথে কথা হলো। বৌদি ফোন ধরিয়ে দিলেন। তখন দাদার কেঁপে কেঁপে জ্বর। ফোনে খালি বললেন কনক, বাঁচি মরি, যাইহোক খালি দোয়া কইরো যেন কষ্ট বেশি না পাই! আমাদের কথা আর আগায়নি।আমার এতো কথা মনে থাকে অথচ একদমই মনে পড়ছেনা শেষ কবে ওনার সাথে দেখা হয়েছিল, এই ছোট দুঃখটি কিনা ওনাকে হারানোর চেয়ে বড় হয়ে এমন ভাবে ফেনিয়ে উঠলো যে গতকাল রাতে একফোঁটা ও ঘুম এলো না। হায়রে মানুষের মন।

কিশোরদা খুব রংচঙয়ে কাপড় পরতেন, পরতেন আধুনিক ডিজাইনের নিত্যনতুন পাঞ্জাবী। কিন্তু আমার ধারণা সাদা পাঞ্জাবীতে ওনাকে দারুণ লাগতো। ঘাড়ের হাঁড়ের সমস্যায় উনি ঝুঁকে হাঁটতেন বলে তাকাতে গিয়ে সবসময়ই চোখ উঁচু করতে হতো। মনে হতো ঘুমে ঢুলুঢুলু। ফেসবুকে একজন মহিলা এনিয়ে বাজে মন্তব্য করায় আমার সাথে ঝগড়াই লেগে গেলো। তখনও শুনে বলেছিলেন থাক, বলুক। লোকের কথায় কি আসে যায়! জীবনে কখনো কিশোরদাকে মানুষের বদনাম গসিপিং করতে শুনিনি। কেউ বললে বলতেন আরে বাদ দাও, কে কী করলো তাতে কী আসে যায়! এমন স্মৃতি লেখার কতকিছু আমার ভাণ্ডারে আছে কিন্তু আর পারছিনা। এই স্মৃতিকাতরতা থেকে বেরুতে হবে নইলে আমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি!

আমাদের একজনই কিশোরদা, আমরা তার সুস্থতার আশায় পথ চেয়ে বসেছিলাম চাতকের মতো। কিন্তু আমাদের ছেড়ে তিনি চলে গেলেন। আমি খুব চাইতাম তাকে আর আলাউদ্দিন আলী ভাইকে রান্না করে খাওয়াব! হলো না। কিন্তু ইচ্ছে এভাবে বাকি রয়ে যায়।


এ দিকে তার প্রয়াণের এক দিন পেড়িয়ে গেলেও এখনো হয়নি তার শেষ কাজ। জানা গেছে তার দুই সন্তান বিদেশ থেকে আসার পরেই হবে তার শেষ কাজ। গতকাল তার ছেলে ফিরে আসলেও তার মেয়ে আসতে সময় লাগবে আরো অনেক দিন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে আগামী ১৫ই জুলাই তার দুই সন্তানই ফিরে আসার পরে তাকে সমহাহিত করা হবে তার জন্মস্থান রাজশাহীর মাটিতে।