‘মেয়ে বড় হচ্ছে, রাইত হইলে চিন্তা আইস্যা পরে। মানুষ কু-প্রস্তাব দেয়। হেরা মনে করে, রাস্তায় থাকি বলে মান-ইজ্জত নাই। অনেকেই টাক-পয়সার লোভও দেখায়’।
মঙ্গলবার (০৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টায় ইন্দিরা রোড হয়ে খামার বাড়ি যাওয়ার পথে ফুটপাতে বসে এ প্রতিবদেককে কথাগুলো বলেন খেটে খাওয়া মানুষ আমেনা।
আমেনা ১২ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে ইন্দিরা রোডের ফুটপাতে থাকেন। গরীব ও রাস্তায় থাকার কারণে মেয়েকে নিয়ে নানা সমস্যায় পরতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শুধু আমেনা নয়, রাজধানীতে বসবাসকারী ফুটপাতের অনেক অভিভাবকেই ‘উঠতি বয়সী’ কন্যাশিশুদের আগলে রাখতে সমস্যায় পড়ছেন। তাদের অভিযোগ, দিনের বেলা যেভাবেই কাটুক না কেন রাত হলে, নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাদের কন্যা সন্তানেরা৷
ফুটপাত বাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এদের মধ্যে অনেক অভিভাবক এ ধরনের ঘটনাকে ‘নিয়তি’ ধরে নিয়ে মুখ বুঝে সহ্য করে যাচ্ছেন। অনেকেই আবার অল্প বয়সী সন্তানকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে ইনকামের ধান্দা খোঁজছেন। এতে করে কন্যা শিশুরা নানা ধরনের ‘স্বাস্থ্যঝুঁকি’তে পড়েছেন।
খামারবাড়ি এলাকায় অভিভাবক শিরীন আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। শিরীনের ফুটপাতেই জন্ম ও ভালোবেসে বিয়ে। তার খাদিজা নামে ১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। ফুটপাতের পরিবেশ দেখে মেয়েকে একটি আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন।

শিরীন আক্তার বলেন, ‘এখনকার পরিবেশ ভালো না। রাত হলেই আনোয়ারা পার্কে অসামাজিক কাজকর্ম হয়। মেয়ে এখানে থাকলে যা দেখবো তাই শিখবো। দিনের বেলা যেমন-তেমন রাইত হইলে, জানোয়াগুলো আইস্যা মেয়েটারে টেনে হেঁছড়ে খাইয়্যা ফালাইবো। এ কারণে মানুষ করার জন্য মাদ্রাসায় র‍াখছি’।
রাজধানীর বিমান বন্দর রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের ভাসম‍ান অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে একই আশঙ্কার কথা জানা যায়। অনেক অভিভাবক ভয়ে ১২/১৩ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেন। এতে করে ‌তাদের মধ্যে বাল্য বিবাহের সংখ্যাও অধিক ।
২ বছর সংসার করতে না করতেই মেয়ে জন্ম দিয়ে বিলকিছের স্বামী পালিয়ে। অনেকে কষ্টে ভিক্ষা করে,বাসায় কাজ করে বড় করছেন মেয়ে জিমকে। এখন জিমের বয়স ১২ বছর। কিন্তু এখনেই নজরে পড়েছেন বিমানবন্দরে রাত্রি যাপন করা রিক্সাচালক ও কর্মচারীদের। অনেকেই এখনই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার চাপ দিচ্ছেন।
বিলকিছ বলেন, কুত্তাগো জ্বালায় আর পারছি না। আমার শরীরটা ভালো না। মেয়েটা সারাদিন ভিক্ষা করে কিছু রোজগার করে। তা দিয়া মা-মেয়ে চলি। কিন্তু মেয়েটার বাড়ন্ত গড়ন নিয়ে বিপাকে পড়ছি। গড়ন ভালো হওয়ায় বেটারা বিয়ে করতে চাচ্ছে, কুপ্রস্তাবও দেয়। রাজি হইনা বলে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের বর্তমানে ৬ লাখ ৭৪ হাজার শিশু রাস্তায় বাস করে, যার‍ ঢাকায় বাস করে প্রায় আড়াই লাখ। এদের মধ্যে কন্যা শিশুরা কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনে শিকার হচ্ছেন। এছাড়া অনেকেই বাধ্য হয়ে অনৈতিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন।