সম্প্রতি বাংলাদেশে একজন মানুষকে নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। বিদেশ থেকে দেশে আসা বা দেশের আসার আগের থেকেই তার নামে বেশ আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়। বলছিলাম নিউয়র্ক ফেরত ডাক্তার ফেরদৌস খন্দকারের কথা। যিনি বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের তান্ডব দেখে স্বেচ্ছায় এসেছিলেন দেশের মানুষের সেবার জন্য। আর তাককে নিয়ে এখন হচ্ছে নানা ধরনের পক্ষ বিপক্ষ আলোচনা সমালোচনা। এবার ডা. ফেরদৌসের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছে দেশের একটি স্বনামধন্য অনলাইন পত্রিকা। আর এই পত্রিকায় নেয়া সাক্ষাতকারটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো হুবহু:-
প্রশ্ন:বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক ধরণের কথাবার্তা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো আপনি বাংলাদেশের সন্তান হিসেবে দেশে এসেছেন। কিন্তু একজন চিক্ৎিসক হিসেবে দেশকে কীভাবে সাহায্য করার কথা ভেবে এসেছেন?

ফেরদৌস খন্দকার: আমি মূলত বাংলাদেশে এসেছি তিন সপ্তাহের জন্য। তারপরে যদি প্রয়োজন হয় তবে এক সপ্তাহের জন্য আমেরিকা গিয়ে আবার ফিরে আসব দুই সপ্তাহে জন্য। আশা ছিল এর মধ্যে পরিস্থিতি ভালো হবে। আমার অধিকাংশ আত্মীয়স্বজনও কিন্তু আমেরিকাতেই থাকে। আমি কিন্তু এখানে থাকার জন্য আসিনি। আমি শুধু এসেছি আমার জন্মভূমির সাধারণ মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে। যদি তাদের চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন হয়, সেটা করতে। যদি চিকিৎসা দিতে নাও পারি তাদের মনোবল বাড়ানোর কাজ যেন করতে পারি- এতটুকুই আশা ছিল আমার।

প্রশ্ন: অনেকেই মানসিক ভীতি দূর করার জন্য মৃদু উপসর্গ নিয়েও হাসপাতালে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে কি আলাদা আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করা জরুরি? এক্ষেত্রে আপনার পক্ষ থেকে কি কোনো উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা আছে?

ফেরদৌস খন্দকার: এই সময়ে আইসোলেশন সেন্টার করতে গেলে অনুমতি একটা বড় বিষয়। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান আমার জানা নেই। তবে হ্যাঁ এটা অবশ্যই মানুষকে সাহায্য করবে। সমাজের যারা ধণাঢ্য ব্যক্তি আছেন তারা যদি এগিয়ে আসেন বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে যায়। পাশাপাশি অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও কিন্তু এগিয়ে আসতে পারে। সরকারের পক্ষে একা সব করা একটু কঠিনই হয়ে যায়।

প্রশ্ন: এক্ষেত্রে আপনি যদি কোনো উদ্যোগ নেন তবে বিএমডিসি কি আপনাকে অনুমতি দিতে পারে?

ফেরদৌস খন্দকার: আমি একজন ক্ষুদ্র মানুষ। সরকার যদি মনে করে এমন একটা বিষয়ে আমাকে কাজে লাগাবে, তবে আমি তাদের পাশে দাঁড়াব। তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য যা বলবে, আমি তাই করব। এই দেশের দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাকে যদি কোনো কাজে লাগানো হয়, তবে আমি আছি। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি দেশের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য আপনার কী বিএমডিসির সার্টিফিকেট আছে?

ফেরদৌস খন্দকার: হ্যাঁ আছে। আর তাতেও যদি সরাসরি চিকিৎসা দেওয়া নাও যায় আমি কিন্তু অন্যভাবে দেশকে সাহায্য করতে পারি। বর্তমানে দেশে যারা সরাসরি কোভিড-১৯ যুদ্ধে আছে তাদের সঙ্গে কো-অর্ডিনেট পারি। ধরুন আমি একটা সেন্টার ভাড়া করে দেবো, যেখানে তারা সেবা দিবে। কিছু পিপিই আমি বাইরে থেকে কিনে এনে সাহায্য করতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা, আমি যেন সাধারণ মানুষের কাছে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। এতে তাদের মনোবল কিছুটা হলেও বাড়াবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোনো সরকারি/বেসরকারি হাসপাতালেই সরকার যদি আপনাকে চিকিৎসা করার অনুমতি না দেয় সেক্ষেত্রে আপনি অন্য কী করতে পারেন?

ফেরদৌস খন্দকার: আমি আসলে বাংলাদেশ সরকার কিভাবে কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে সেখানে যেতে চাই না। আমি যেতে চাই হাসপাতালের বহির্বিভাগে যেখানে সাধারণ রোগীরা থাকে। সেখানে যদি আমি কিছু মানুষকে সাহায্য করতে পারি তবে তাদের সমস্যা কিছুটা হলেও দূর হবে। আমি সেখানেই আসলে নিজেকে নিয়োজিত করতে চাই। সরকার বা চিকিৎসকেরা যেভাবে চাইবে আমি সেভাবেই কাজ করতে পারব। তবে আমার ইন্টারেস্ট থাকবে যেকোনো পরিস্থিতিতে সাধারণ রোগীদের জন্য কাজ করে যাওয়া। বাংলা মায়ের সন্তান হিসেবে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের মনের ভীতি দূর করে তাদের পাশেই দাঁড়াতে চাই আমি।

প্রশ্ন: কখন বা কোন জায়গা থেকে আপনি উপলব্ধি করলেন যে, আপনাকে বাংলাদেশে আসতে হবে? নাকি এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে?

ফেরদৌস খন্দকার: দেশের প্রতি প্রতিটা মানুষেরই দায়িত্ব থাকে। আর তাই দেশের সন্তান হিসেবেই আমার এখানে আসা। এখানে কোনো রাজনীতি বা অর্থনীতির কারণে আমি আসিনি। যেহেতু আমি যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি দেখেছি, সেখানে মানুষের সমস্যাগুলো বুঝতে পেরেছি। আমি জানি, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের মানসিক শক্তি কতটুকু প্রয়োজন। আমি যদি সেই জায়গা থেকে সাধারণ মানুষের কিছুটা উপকার করতে পারি, তবে সেটাই আমার বড় পাওয়া হবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশের চিকিৎসকরা যেভাবে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তাদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ কি আছে?

ফেরদৌস খন্দকার: উনারা দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের জীবনকে বাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। অনেক চিকিৎসক ভাই-বোন আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেই মৃ’/ত্যু’/ব’/র’/ ণ করছেন। তারপরও তাদের কাজ করে যেতে হবে। এই যুদ্ধে চিকিৎসকরা হলেন যোদ্ধা, যাদের দিকে তাকিয়ে মানবসমাজ। আমরা জানি, আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। এর মধ্যেও যার যার স্থান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।

প্রশ্ন: বাংলাদেশে অনেক মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমের সংবাদের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাচ্ছেন। এটা আসলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কী ধরণের বিপদ ডেকে আনতে পারে?

ফেরদৌস খন্দকার: বিজ্ঞান কী বলেছে সেটিই ফলো করা উচিত। এক্ষেত্রে রোগীর অবশ্যই চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ খাবেন। যুক্তরাষ্ট্রেও কিন্তু তাই হয়। আমাদের দেশে যারা চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে ফার্মেসিতে গিয়ে নিজের মতো করে ওষুধ কিনে খেয়ে থাকেন তাদের কাছে অনুরোধ- এমনটা করবেন না। চিকিৎসকের সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ করবেন। এমন কোনো মিরাকল ওষুধ এখনও বের হয়নি যে, সেটি খেয়ে কেউ একদিনেই ভালো হয়ে যাবে। আর তাই সাবধান হতেই হবে।

প্রশ্ন: অনেকেই এখন মানসিকভাবেও কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। একজন চিকিৎসক হিসেবে সারাবাংলার পাঠকদের জন্য কিছু বলবেন?

ফেরদৌস খন্দকার: কোভিড-১৯ পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি রোগ নয়, এটি একধরনের মানসিক যুদ্ধও। এখানে এই রোগের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই কিন্তু মানসিকভাবে দুর্বল করে ফেলে। এটা হলেই যে কেউ মারা যাবে বিষয়টা কিন্তু তেমনও না। এখন পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ মানুষ সুস্থ হয়ে উঠছেন। এই উপাত্তটিকে আগলে ধরে সবার মনোবল বাড়ানো দরকার বলে মনে করি। খামোখা ইন্টারনেট বা নিউজ মিডিয়া থেকে যা ইচ্ছে তা নিয়ে নিয়ে নিজের ওপর অ্যাপ্লাই করার মানে নাই। এটা কিন্তু একটা আত্মঘাতী বিষয়ও হতে পারে।

প্রশ্ন: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে র‌্যাপিড টেস্ট কিট ব্যবহারে তারা এখন অনুমতি দিচ্ছে না। বাংলাদেশেও দেওয়া হয় নাই। অনেকের ধারণা, এটাতে মনে হয় কোনো সমাধান আসবে। সেক্ষেত্রে আপনি কী মনে করেন?

ফেরদৌস খন্দকার: র‌্যাপিড টেস্ট দুই ধরনের। একটা অ্যান্টিবডিভিত্তিক টেস্ট আর আরেকটা হলো অ্যান্টিজেনভিত্তিক টেস্ট। দুইটা দু’ধরনের কাজ করে থাকে। অ্যান্টিজেনভিত্তিক টেস্টটা হলো মূলত ডায়াগনসিস করার জন্য। সেটা নিয়ে আসলে পৃথিবীতে সবার অবস্থা হলো- নো ওয়ে ক্লোজ টু পারফেক্ট। চীন, আমেরিকা, সুইজারল্যান্ড কেউই আসলে পারফেক্টের কাছাকাছি নয়। আর তাই এটি অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে মারার মতো। সেজন্য এটিকে ব্যবহার করা হয় না। আরেকটি র‌্যাপিড টেস্ট হলো অ্যান্টিবডি টেস্ট। এটা সাধারণত করা হয় সার্ভিলেন্সের জন্য। অর্থাৎ কারও মধ্যে রোগটি হয়ে গেছে। তার অ্যান্টিবডি হয়ে থাকলে সেটি আসলে এই কিটে শনাক্ত হতে পারে। এখন বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগটা সেভাবে আসেনি। এখনই যদি র‌্যাপিড টেস্ট করা হয় তবে প্রচুর মানুষ টেস্ট করাবে। কিন্তু ফলাফল আসতে পারে শূন্য। তাছাড়া এই টেস্টগুলোও কিন্তু এখনও এতটা পারফেক্ট না। সেজন্য আরও কিছু সময় ধৈর্য্য ধরতে হবে। পিসিআরর সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবেই। এর কোনো বিকল্প নেই। নমুনা সংগ্রহের জন্য বুথ বাড়ানো যেতে পারে।

প্রশ্ন: আপনি এখন কোয়ারেনটাইনে আছেন ১৪ দিনের জন্য। এর পর কীভাবে দেশের জন্য কাজ করতে চান?

ফেরদৌস খন্দকার: আমাকে যদি কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয় তবে আমি যেমনটা আগে বলেছিলাম- সাধারণ মানুষের চিকিৎসার কাজে ইন্টারেস্ট দেখাতে চাই। সাধারণ মানুষ হয়তো চিকিৎসককে খুঁজছে কিন্তু চিকিৎসকরা হয়তো কোভিড-১৯ চিকিৎসাসেবাদানে ব্যস্ত। সেক্ষেত্রে আমি সাধারণ রোগীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। এর মধ্যে যদি কোভিড-১৯ রোগী পড়ে যায় তবে সেটির ব্যবস্থা আলাদা। কিন্তু সাধারণ রোগীদের পাশে থাকাটাই আমার মূল ভাবনা। আমি বাংলাদেশের সেইসব সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চাই, যারা হয়তো একজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলতে পারলেই মানসিকভাবে সান্ত্বনা পাবেন, শক্তি পাবেন। মোদ্দা কথা আমি এই দেশের সন্তান, দেশের জন্যেই কাজ করতে এসেছি। কোনো রাজনীতি না অন্য কোনো কিছু না। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আমি দেশের সেবা করতেই এসেছি। এই দেশের মাটিতে আমার জন্ম, সেই মাটির প্রতি ঋণ সবারই থাকে। আমি সেই ঋণের কিছুটা শোধ করতে চাই।
শেষ: এতক্ষণ সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

এ দিকে দেশে করোনার পরিস্থিতি দিন দিন চলে যাচ্ছে খারাপের দিকে। এখন করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৯০ হাজার ছুই ছুই। প্রতিদিনই দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা হচ্ছে আরো বেশি। আড় এই সময়ে দেশে অনেক চিকিৎসক ও করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি মা’/রাও যাচ্ছেন। যার ফলে দেশে এখন চিকিৎসকের অনেক জরুরী দরকার। আর এই কারনে তার প্রতি দেশের মানুষের একটি আলাদা অনুভূতি কাজ করছে।