সারা পৃথিবীতে স্থলভাগের থেকে সব বেশি পরিমান রয়েছে পানি। যদি পুরো পৃথিবীকে ৪ ভাগে ভাগ করা হয় তবে তার তিনভাগই হবে পানি। মোট মহাসাগর আছে পাচটি। মহাসাগরগুলো একত্রে পৃথিবীর মোট আয়তনের (৩.৬১×১০১৪ বর্গ মিটার) প্রায় ৭০.৯ শতাংশ স্থান দখল করে আছে। এ বিপুল জলরাশি আবার অনেকগুলো মহাসাগর ও ছোট ছোট সমুদ্রে বিভক্ত। মহাসাগরের অর্ধেকেরও বেশি জায়গার গড় গভীরতা ৩,০০০ মিটারেরও (৯,৮০০ বর্গফুট) বেশি।
এছাড়াও আছে ছোট নদী, সমুদ্র। নদীর কূল নাই-কিনার নাইরে; আমি কোন কূল হইতে কোন কূলে যাব,কাহারে শুধাইরে? জসীম উদ্‌দীনের রঙিলা নায়ের মাঝি কবিতা পড়েছেন নিশ্চয়? কিংবা সুর করে এই গানটি। এটা কবির কল্পনা ছিল। তবে বাস্তবেই আছে এমন একটি সমুদ্র। যার কোনো কূল কিনারাই নাকি নাই, এমনটাই দাবি বিজ্ঞানীদের। না অন্য কোনো গ্রহে নয়, আছে এই পৃথিবীতেই।

প্রকৃতির এই অনবদ্য সৃষ্টি লুকিয়ে আছে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে। তীর না থাকা সাগরটির নাম সারগ্যাসো সাগর। সাগরটির দৈর্ঘ্য ৩২০০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১১০০ কিলোমিটার। সারগ্যাসো সাগরই পৃথিবীর একমাত্র সমুদ্র, যার কোনো তীর নেই। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১০৯০ খ্রিস্টাব্দে আলমোরাভিদ সাম্রাজ্যের সুলতান আলি ইবন ইউসুফ একটি জাহাজ পাঠিয়ে ছিলেন এই এলাকায়। জাহাজে ছিলেন বিখ্যাত মানচিত্র-নির্মাতা মুহাম্মদ আল-ইদ্রিসি। তিনি সাগরটির মানচিত্র নির্মাণ করেছিলেন।

৩৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থাকা সারগ্যাসো সাগরের পানি অস্বাভাবিক রকমের স্বচ্ছ। পানির রং ঘন নীল। রোদ্রৌজ্জ্বল দিনে পানির ২০০ ফুট নিচ পর্যন্ত দেখা যায়। আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে সবচেয়ে লবণাক্ত অঞ্চলও এই সারগ্যাসো সাগর। সারগ্যাসো সাগর ভরপুর জৈববৈচিত্রের প্রাচুর্য্যে। খাদ্যের বিপুল সম্ভার এবং শ্যাওলার আড়ালে লুকিয়ে আছে বিভিন্ন প্রকার সামুদ্রিক প্রাণী। আমেরিকান ও ইউরোপীয় ইলের দল ডিম পাড়ার সময় হলে সারগ্যাসো সাগরে চলে আসে।

সারগ্যাসো সাগরকে রহস্যের খনি বলে বর্ণনা হয়েছিল অনেক বিখ্যাত উপন্যাসে। চতুর্থ শতাব্দীর লেখক রাফাস ফেস্টাস অ্যাভেনিয়াসের লেখাতে এই সাগরের উল্লেখ পাওয়া যায়। উইলিয়াম হোপ হজসনের লেখা উপন্যাস দ্য বোট অফ দ্য গ্লেন ক্যারিগ, ভিক্টর অ্যাপেলটনের লেখা ডন টার্ডি ইন দ্য পোর্ট অফ লস্ট শিপস, জুলে ভার্নের লেখা টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি উপন্যাস ছাড়াও আরো অসংখ্য উপন্যাস ও গল্পে সারগ্যাসো সাগরের কথা লেখা আছে।

সাগরের নামকরণ করে পর্তুগিজরা। সাগরের বুকে তারা দেখেছিল সারগাসম নামে সামুদ্রিক শৈবালটির অস্বাভাবিক প্রাচুর্য। আর সেখান থেকেই শৈবালটির নামেই সাগরটির নাম দিয়ে দেয় সারগ্যাসো। সাগরের পানির উপরিভাগ ঢেকে থাকে এই শৈবালে। সাগরটির কিছু কিছু জায়গায় শৈবালের স্তর এতটাই পুরু হয় যে, সেখান দিয়ে জাহাজ চলাচল করতে পারে না। এছাড়া পানিতে কোনো স্রোত না থাকায় স্রোতের সাহায্যও পায় না জাহাজগুলো। ওইসব জায়গা দিয়ে জাহাজ চালাতে গেলে জাহাজের প্রপেলারে শ্যাওলা জড়িয়ে প্রপেলার বন্ধ হয়ে যায়। একই জায়গায় আটকে থাকে জাহাজ। উন্মত্ত বাতাসের ঝাপটায় দুলতে শুরু করে। ছোট আকৃতির বোট হলে ডুবে যায়।

এমন অনেক জাহাজ হরহামেশাই এখানে শৈবালে আটকে ডুবে গেছে। একবার একটি ইউরোপীয় জাহাজ সারগ্যাসো সাগরে ঢুকে পড়েছিল। জাহাজে ছিল প্রচুর ঘোড়া। ঘোড়াগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বিক্রির উদ্দেশ্যে। কিন্তু সারগ্যাসো সাগরে ঢোকার পর রুদ্ধ হয়েছিল জাহাজের গতি। জাহাজ আটকে গিয়েছিল শ্যাওলায়। জাহাজের ওজন কমিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্য সব ঘোড়া জলে ফেলে দিয়েছিল নাবিকরা।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাহাজের নাবিকদের কাছে মূর্তিমান বিভীষিকা হয়ে আছে সারগ্যাসো সাগরটি। এর তীর না থাকলেও একে ঘিরে আছে আটলান্টিক মহাসাগরের চার ধরনের স্রোত। সারগ্যাসো সাগরের পশ্চিমে আছে গালফ স্ট্রিম, উত্তরে আটলান্টিক কারেন্ট, পূর্বে ক্যানারি কারেন্ট এবং দক্ষিণে নর্থ-ইকুয়েটোরিয়াল কারেন্ট। এই চারটি স্রোত চক্রাকারে ঘুরে চলেছে অবিরাম। চারটি স্রোতের মাঝে থাকা সারগ্যাসো সাগরের জল স্থির ও প্রবাহহীন। তাই উত্তাল আটলান্টিক মহাসাগরের সব চেয়ে শান্ত অঞ্চল এই সারগ্যাসো সাগর।

ভাবছেন হয়তো আটলান্টিকের মাঝে কী করে এলো এত শৈবাল! আসলে সারগ্যাসো সাগরটিকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখা পানির স্রোতই বয়ে নিয়ে এসেছে সামুদ্রিক শৈবাল। এই পানিতে স্রোত না থাকায় এখানেই সেগুলো জমা হয়েছে। এখনো প্রতিনিয়ত জমা করে চলেছে। এভাবেই সারগ্যাসো সাগর একদিন হয়ে উঠে শৈবাল সাগর। শৈবালের ফাঁদে পড়ে পানি হয়ে যায় স্রোতহীন ও শান্ত।

তবে বর্তমানে এই সাগরের পানি দূষিত হয়ে উঠছে। সারগ্যাসো সাগর আজ হয়ে উঠেছে প্লাস্টিকের ডাস্টবিন। এতে করে আটলান্টিক মহাসাগর জুড়েও ছড়িয়ে পড়ছে দূষণ। এর দূষণ ঠেকাতে নেয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। পর্তুগালের স্বশাসিত আজোর দ্বীপপুঞ্জ, বারমুডা, মোনাকো, ব্রিটেন ও আমেরিকাকে নিয়ে ২০১৪ সালের ১১ মার্চ গড়ে উঠেছে ’সারগ্যাসো সি কমিশন’। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে সঙ্গে নিয়ে ’সারগ্যাসো সি কমিশন’ কাজ করছে সারগ্যাসো সাগরকে বাঁচাতে।

এ দিকে এই সাগর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে নানা ধরনের জল্পনা কল্পনা। বিশেষ করে সমুদ্রে যারা সব সময়ই থাকেন তাদের মধ্যে এটি যেমন ভয়ের একটি বিষয় আর সেই সাথে রহস্যেরও একটি জায়গা এই সাগরটি।