সারা দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে চলতি বছরের মার্চ মাসে। শুরুতে কমন থাকলেও সময়ের ব্যবধানে করোনার প্রকোপ বেড়ে গেছে সারা দেশে। প্রতিনিয়তই এই করোনা এখন দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ছে একেবারে মহামারি আকারে। এ দিকে করোনার ধাক্কায় দেশে পৌনে দুই কোটি মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। সরকারি এই হিসাবের পাশাপাশি এই করোনাকালেই কয়েক হাজার মানুষ উঠে এসেছে কোটিপতির তালিকায়। গবেষকদের বিশ্লেষণ, কর্মসংস্থানের অভাবেই এভাবে দিনদিন প্রকট হচ্ছে আয় বৈষম্য। আর অর্থনীতির এই বিপরীতমুখী চলনকে ’নিষ্ঠুর’ বলছেন স্বয়ং পরিকল্পনামন্ত্রী।
করোনাকালে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন দেশের নিম্ন আয়ের মানুষ। রাজধানীর ঢাকায় সকাল সকালই দেখা যায়, ব্যস্ততা বাড়ছে নানা কাজের, কাজের সন্ধানে ছুটে চলা মানুষের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও যারা কাজ জোটাতে পারেননি তাদের হিসেবের খাতাটাও শূন্য। যেদিন কাজ মেলে সেদিনও মেলে না তাদের সংসার খরচের সরল অঙ্ক।

কয়েক সপ্তাহ আগে নেত্রকোনার পূর্বধলা থেকে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসেছেন আব্দুস সালাম। তিনি মাটিকাটা কাজ করেন। কাজ জুটলে প্রতিদিন ৩শ থেকে ৪শ টাকা মজুরি পান। কিন্তু কয়েকদিন ধরে তিনি কোন কাজ পাচ্ছেন না। তাই ৫ সদস্যের পরিবারের খরচ মেটানো স্বাভাবিকভাবেই খুব কঠিন হয়ে পড়েছে এই দিনমজুরের।

জামালপুর থেকে রাজধানীতে দিনমজুরের কাজ করতে এসেছেন এক সময়ের হোটেল ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম। তার সংসার মা, স্ত্রী-সন্তান মিলে ৬ সদস্যের। কাজ পেলে দিনে ৪শ থেকে ৫শ টাকা পান। কিন্তু বর্তমানে মাসে ১০ থেকে ১২ দিনের বেশি কাজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান তিনি। এই উপার্জন দিয়ে ঘর ভাড়া, বাজারসহ নিত্যদিনের ব্যয়- হিসাব তাই মেলাতে পারেন না তিনি।

মানিকগঞ্জের ফিরোজ মোল্লা। বয়স ৬২ বছর। করেন কাঠমিস্ত্রীর কাজ। শারীরিক নানা অসুস্থতায় ভুগছেন তিনি। তবুও জীবিকার তাগিদে নিজ গ্রাম ছেড়ে রাজধানীর মেরুল-বাড্ডা সড়কের পাশে অপেক্ষা করছেন কাজের জন্য। কিন্তু দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে গেছে এখনও কাজ মেলেনি। গত দুদিনও কাজ পাননি।

এই করোনাকালে চাপে পড়ে কুড়িগ্রামের যুবক শহিদুল ইসলাম একটু উপার্জনের নিশ্চয়তায় মাসখানেক হলে এসেছেন রাজধানীতে। তিনিও বসে আছেন। কাজ পাচ্ছেন না। তার ওপর পরিবারের ৫ সদস্য নির্ভরশীল।

বাড্ডার বাসিন্দা রুবেল। বয়স ৩০ বছর। তিনি এই এলাকায় দিনমজুরের কাজ করছেন প্রায় ১২ বছর ধরে। করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর কাজের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। কাজ কমছে। আবার আগে যে কাজ করে তিনি দিনে ৫শ টাকা পেতেন, এখন ৩শ টাকার বেশি পান না।

পান-বিস্কুটের দোকানদার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহরও ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে এবারের করোনায়। তিনি জানান, বাড্ডায় তার দোকানের পাশে প্রতিদিন প্রায় ৫শ দিনমজুর কাজের জন্য সকাল সকাল আসেন। কিন্তু দিন শেষ কাজ পান মাত্রা একশ’ থেকে দেড়শ’ মানুষ। বাকিদের ফিরতে হয় কাজ না পেয়ে।

পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, গেল ৯ মাসেরও কম সময়ে দেশের ৯ শতাংশ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। অর্থাৎ তাদের দৈনিক মাথাপিছু আয় ১.৯ ডলার বা ১৬২ টাকার নিচে নেমে এসেছে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, গেল এপ্রিল-মে-জুন এই তিন মাসেই নতুন করে কোটিপতি হয়েছেন সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ। এসব পরিসংখ্যানে প্রমাণ হয় দেশে বাড়ছে আয় বৈষম্য।

আয় বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ জানান, দেশে বর্তমানে সর্বনিম্ন আয় করা ৫ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। সেখানে শীর্ষ আয় করা ৫ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে ২৮ ভাগের বেশি সম্পদ। কেউ বেশি আয় করলে তা সমস্যা নয়। তবে রাষ্ট্রের নজরে থাকা দরকার যেন সবাই কমবেশি আয়ের সুযোগ পান। আর এটা করতে হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর কাজের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়াতে হবে।

ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য জিডিপি বাড়ালেও সমাজের জন্য কল্যাণকর হতে পারে না বলে মনে করেন স্বয়ং পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কল্যাণকর অর্থনীতি সেটাই যেখানে নিম্ন আয়ের মানুষের হাতেও বেশ সম্পদ থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে তেমনটা এখন নেই। এ অবস্থাকে তিনি অমানবিক বলতে চান না। তবে তার মতে এটা নিষ্ঠুর অবস্থা। এই পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

মানব উন্নয়ন, ব্যবসা সহজীকরণ, এমন সব সূচকেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। তবে এই উন্নয়নের ঢেকুর তোলার সময় যেন গলার কাটা না হয়ে দাঁড়ায় আয় বৈষম্য; সেভাবেই হবে আগামীর পরিকল্পনা, এই প্রত্যাশা সকলের।

চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে শুরু হয় এই করোনা ভাইরাসের। এরপর থেকে একে একে ছড়াতে থাকে বিশ্বব্যাপি। বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত দেশের সংখ্যা এখন দাড়িয়েছে ২১৫। বিশ্বে মোট করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন দাড়িয়েছে ৭ কোটিরও বেশি। আর সেই সাথে বেড়ে গেছে করোনায় প্রাণহানীর সংখ্যাও। তবে সুখবর এই যে করোনার ভ্যাকসিন নিতে শুরু করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলো।