পৃথিবীটা বড়ই আজব। আর তার থেকেও আজব এই পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন শখ।কেউ প্রেমিকার জন্য স্টেশনে কাটিয়ে দেন জীবনের পুরোটা সময়। কেউ বা চুরি যাওয়া ব্যাগের জন্য বিমানবন্দরে কাটিয়ে দেন ১৮ বছর। ভেবে নিশ্চয় খানিকটা অবাক হচ্ছেন। অবাক হওয়ারই কথা। তেমনি এক ব্যক্তি মেহরান করিমি নাসেরি। যিনি অধিক পরিচিত স্যর আলফ্রেড মেহরান হিসেবে। জীবনের ১৮টি বছর তিনি ফ্রান্সের শার্লে দি গৌলে বিমানবন্দরেই কাটিয়ে দিয়েছেন। সে কারণে তিনি আবার \’দ্য টার্মিনাল ম্যান\’।

তার বিমানবন্দরে থাকতে শুরুর আগে অনেক লম্বা গল্প আছে। নাসেরির জন্ম ইরানে। বাবা ছিলেন ইরানের অ্যাংলো-পার্সিয়ান তেল কোম্পানির চিকিত্সক। মায়ের জন্ম স্কটল্যান্ডে। তিনিও কর্মসূত্রে এই কোম্পানিতে নার্স ছিলেন। ১৯৭৩ সালে ইউনির্ভাসিটি অব ব্রাডফোর্ড থেকে ৩ বছরের একটি কোর্স করার জন্য তিনি ব্রিটেনে আসেন। তারপর ফের ইরানে ফিরে যান।

১৯৭৭ সালে নাসেরি দাবি করেন, ইরানের শেষ রাজা মহম্মদ রেজা শাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তাকে ইরান থেকে বার করে দেয়া হয়। তারপর একাধিক দেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন জানান তিনি। তবে তার আবেদন গৃহীত হয়নি। বেলজিয়ামের ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজি তাকে উদ্বাস্তু তকমা দেয়। যদিও ইরান থেকে তাকে বার করে দেয়া হয়েছিল বলে নাসেরি যে দাবি করেছিলেন তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

উদ্বাস্তু তকমা মেলায় তিনি ইউরোপের বেশ কিছু দেশে ঢোকার অনুমতি পেয়ে যান। বাকি জীবনটা ব্রিটেনে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন তিনি। ১৯৮৮ সালে লন্ডনে যাওয়ার জন্য ফ্রান্স থেকে বিমানে ওঠেন তিনি। লন্ডনে অবতরণের পর ইমিগ্রেশন অফিসারদের কাছে নিজের পাসপোর্ট দেখাতে পারেননি। ফলে বিমানবন্দর থেকেই তাকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানেই তিনি গ্রেফতার হন।

তিনি দাবি করেছিলেন, লন্ডনের জন্য বিমান ধরার সময় তার ব্যাগ চুরি হয়ে যায়। সেই ব্যাগেই পাসপোর্ট-সহ যাবতীয় জরুরি নথি ছিল। ফরাসি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করলেও শেষমেশ তিনি ছাড়া পেয়েছিলেন। কারণ লন্ডনের জন্য ফ্রান্সের বিমানবন্দর থেকে বিমান ধরার সময় তিনি নথি দেখিয়েছিলেন। সেই রেকর্ডের ভিত্তিতেই তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।



আইনের চোখে নাসেরি উদ্বাস্তু ছিলেন। নির্দিষ্ট করে কোনো দেশেই তাকে পাঠানো সম্ভব ছিল না। আর তার ইচ্ছা ছিল ব্রিটেন যাওয়ার। সেটাও সম্ভব ছিল না। সেই থেকে ফ্রান্সের ওই বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনাল হয়ে ওঠে তার ঘর-বাড়ি। তাকে বিমানবন্দর থেকে সরানোর অনেক চেষ্টা হয়েছে। মামলাও হয়েছে। কিন্তু ১৯৯২ সালে ফ্রান্সের আদালত জানিয়ে দেয়, নাসেরি বেআইনিভাবে বিমানবন্দরে প্রবেশ করেননি। তাই তাকে সেখান থেকে সরানো যাবে না।

১৯৮৮ সালের ২৬ অগস্ট থেকে ২০০৬ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সের শার্লে দি গৌলে বিমানবন্দরে থেকেছেন। থাকা, খাওয়া, পড়াশোনা সব কিছুরই সঙ্গী ছিল এই বিমানবন্দর। ২০০৬ সালের জুলাইয়ে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত কেউ তাকে বিমানবন্দর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি। নাসেরি চেয়েছিলেন ব্রিটিশ হতে। তিনি নিজের নাম বদলে হয়েছিলেন স্যর আলফ্রেড মেহরান। তাই পরবর্তীকালে বেলজিয়াম এবং ফ্রান্স তাকে নাগরিকত্ব দিতে চাইলেও নাসেরি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।

২০০৬ সালে অসুস্থ হয়ে এক নম্বর টার্মিনাল ছাড়েন নাসেরি। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করার পরই তার থাকার জায়গা ভেঙে ফেলেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এর পর হাসপাতাল থেকে তার দায়িত্ব নেয় ফ্রান্সের রেড ক্রস। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কিছু দিন তাকে বিমানবন্দরের কাছে একটি হোটেলে রাখা হয়। পরে তাকে অভিবাসীদের একটি হোমে নিয়ে যাওয়া হয়।


এ দিকে তার এই ঘটনাটি এখন মানুষের মুখে মুখে। সকলেই এটাকে একটি চর্চার বিষয় বানিয়ে ফেলেছেন। বিশেষ করে ঘরবাড়ি ছেড়ে একটা মানুষ কিভাবে কাটিয়েছেন বাইরে তাই ভেবেই তাজ্জব বনে গেছেন সবাই। বিমানবন্দরের এক নম্বর টার্মিনালে দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি পড়াশোনা করে, ডায়েরি লিখে কাটিয়েছেন। বিমারবন্দরের কর্মীদের কাছ থেকেই খাবার খেতেন, তাদের সঙ্গে বসেই গল্প করতেন। ২০০৪ সালে নাসেরির আত্মজীবনী \’দ্য টার্মিনাল ম্যান\’ প্রকাশিত হয়। তার জীবনের উপর ভিত্তি করে ফিল্মও হয়েছে।\’লস্ট ইন ট্রানজিট\’ নামে একটি ফরাসি ফিল্ম মুক্তি পেয়েছিল তার জীবনী অবলম্বনে। লেখক-পরিচালক অ্যালেক্সি কুরোস তাকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানিয়েছেন।