পেশায় তিনি ম্যাজিস্ট্রেট। সৎ কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে। যখন যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, প্রশাসনিক এখতিয়ার প্রয়োগ করে দেশের নাগরিকের সেবা নিশ্চিত করে সুনাম কুড়িয়েছেন। তবে কাজ করতে গিয়ে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি দেখে হাঁপিয়ে উঠেছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আর লাইফ স্টাইলের মধ্যে যে বিশাল ফারাক তা তাঁর মধ্যে এনেছে হতাশা। শেষপর্যন্ত ফেসবুকে ফাটালেন এক বোমা। দুর্নীতি আর নানা অসংগতি নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লিখে ফেললেন এক খোলা চিঠি।
বানসুরি এম ইউসুফি নামে প্রশাসন এবং সামাজিক গণমাধ্যমের জগতে পরিচিত এই ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’কে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘দুর্নীতি আমার পক্ষে সম্ভব নয় স্যার। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেবো।’
বর্তমানে ঢাকা বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত বানসুরি সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধে নানাবিধ কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচিত হওয়া এই ম্যাজিস্ট্রেট প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে সরাসরি আপনার বরাবর এই পত্র লেখা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। আমি জানি, আপনি না চাইলেও এর জন্য আমাকে অনেক শো-কজ মোকাবেলা করতে হবে। আমার প্রমোশনে সমস্যা হতে পারে, এমনকি চাকরিও চলে যেতে পারে। আফসোস থাকবে না, কারণ চাকরিতে এসেছিলাম দেশের সেবা করতে, দুর্নীতি কিংবা ক্ষতি করতে নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র এবং জাপান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনকারী বানসুরি এম ইউসুফি বিদেশে উন্নত জীবন ছেড়ে বাংলাদশে এসে প্রশাসনে যোগদান করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘বিদেশের চাকচিক্য ছেড়ে দেশে এসে চাকরিতে জয়েন করেছিলাম কেবল এই অনুভূতি থেকে যে, এই দেশ আমাকে মানুষ করেছে। এই দেশের অর্থে শিক্ষিত হয়ে বিদেশের সেবা করা বিবেকে সায় দেয়নি। প্রচণ্ড ভালোবাসি এ মাটিকে, যার কোলে শুয়ে আছে আমারই বাবা আমারই মা, যাদের পাশে শোয়া ছাড়া আমার কখনোই ঘুম আসতো না।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অবাক লাগতো, সরকারি অফিসাররা কেন দুর্নীতি করে! আজ আর লাগে না। ক্ষোভ হয়। কেন আসলাম সরকারি চাকুরিতে! দেশের সেবা করতে এসেছি, আমার পরিবার সন্তান কি এদেশের বাইরে? ক্লাস সিক্সের এক সন্তানকে ভর্তি করাতে ১৮ হাজার টাকা দিতে হয়, মাসে ২-৩ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। অথচ আপনি আমাকে দিচ্ছেন দুই বাচ্চার জন্য মাসে মাত্র এক হাজার টাকা শিক্ষা ভাতা, অর্থাৎ প্রতি বাচ্চার জন্য মাসে ৫০০ টাকা।’
এই অবস্থায় আমি কী করতে পারি?
১. দুর্নীতির আশ্রয় নিতে পারি
২. বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ করে দিতে পারি।
দুর্নীতি আমার পক্ষে সম্ভব নয় স্যার। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাচ্চাদের পড়াশোনা বন্ধ করে দেবো। অথচ এর কোনটিই করতে হয় না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমি বলবো না, আমাদের এই গরিব দেশে দুই বাচ্চার জন্য শিক্ষাভাতা এক হাজার টাকার বেশি হোক। আমরা চাই, সরকারি বেসরকারি স্কুলগুলোর এই লাগামহীন বেতনবৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা হোক, যাতে আমার মত আর কাউকে সন্তানের পড়ালেখা বন্ধের সিদ্ধান্ত না নিতে হয়।’
দেশের ইতিহাসে সম্ভবত প্রশাসনের কোনো বিসিএস ক্যাডার দুর্নীতি এবং যাপিত জীবনের নানা অসংগতি নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে খোলা চিঠি দিলেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ব্যবহার করেছেন দেশে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুককে।
টাইমলাইনে এই পোস্ট দেয়ার পর রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত লাইক পড়েছে প্রায় ছয় হাজার এবং পোস্টটি শেয়ার করা হয়েছে ছয়শ’র অধিক। পোস্টে মন্তব্যকারীরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন, ম্যাজিস্ট্রেট বানসুরি এম ইউসুফি’র এই পোস্টকে একটি সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখে তাঁর বক্তব্য আমলে নিয়ে জীবনের অসংগতি দূরীকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে।taza-khobor

News Page Below Ad