এবারের (একাদশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহু আলোচিত বিতর্কের ইতি টানা হলো লন্ডন প্রবাসী বিএনপি নেতা তারেক রহমানের কথিত সিদ্ধান্তের জের ধরে। নির্বাচনের ফলাফল, বিশেষ করে এর শুদ্ধতা ও বৈধতা নিয়ে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্টের প্রতিবাদ, ফলাফল প্রত্যাখ্যান ইত্যাদি নিয়ে সংবাদপত্রের ভাষায় অনেক নাটক সংঘটিত হলো। অনেক কালি খরচ হলো উপসম্পাদকীয় কলামের বদৌলতে।
নির্বাচনী রাজনীতির উত্তপ্ত পরিবেশে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। অতীতের জের ধরে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ক্ষুব্ধ বিএনপি অবিশ্বাস্য গুটিকয় আসনের জয় প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল; সেইসঙ্গে সংসদে যোগ না দেওয়ার। আবার সেই শূন্যতা, সেই একজোট-দলীয় শাসন, বাস্তবে আওয়ামী লীগের শাসন।
এ পর্যন্ত যেসব তথ্য সংবাদপত্রে প্রকাশ পেয়েছে তাতে দেখা যায়, বিএনপির শীর্ষ নেতারা ক্ষুব্ধ, প্রতিবাদী, সংসদ থেকে দূরে থাকার পক্ষে; কিন্তু কোনো বলিষ্ঠ, বিকল্প, দলের পক্ষে উপকারী ভূমিকার কথা কারও বক্তব্যে উঠে আসেনি। অধিকাংশই ছিলেন মূলত প্রায় নীরব। খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে কিছু দাবি, কিছু বিবৃতি- প্রধানত মহাসচিবের পক্ষ থেকে- এটাই ছিল এ সময়কার বিএনপি-রাজনীতির কলাকৌশল; যদি এ ভূমিকাকে ’কৌশল’ বলে মানা যায়।
ঐক্য প্রক্রিয়ার শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনও তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নির্বাচন-সংক্রান্ত অনিয়মাদি নিয়ে, যা ছিল প্রকাশ্য আলোচনার বিষয়। আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে বরাবর অনড়। তাদের মতে, নির্বাচন ঠিকঠাকই হয়েছে। এখন বিএনপি আবারও সংসদ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলে বড় ভুল করবে। তাতে গণতন্ত্র মার খাবে না- সংসদ যথারীতি সক্রিয় থাকবে।
সংবাদপত্রে বিশ্নেষকদের লেখায় বিএনপির রাজনৈতিক সংকটের কথাই উঠে এসেছে। বাস্তবিকই এ নির্বাচনে যোগ দেওয়া নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তার পানি গড়ানোর পর যদিবা ঐক্য প্রক্রিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি নির্বাচনী মাঠে নেমেছিল অনেক আশা নিয়ে- তাদের সে আশা পূরণ হয়নি।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কৃৎকৌশল সবকিছু ভণ্ডুল করে দিয়েছে, যদিও নির্বাচনের শুদ্ধতা নিয়ে দেশে-বিদেশে, আন্তর্জাতিক বিশ্নেষক মহলে অনেক প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সেগুলোকে পাত্তা দেয়নি। আন্তর্জাতিক মহলও শেষ পর্যন্ত আর রা কাড়েনি। ক্ষুব্ধ বিএনপি তাই ঐক্য প্রক্রিয়াসহ নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদে যোগ না দেওয়ার পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রাজনীতিতে লোভ এক মারাত্মক ব্যাধি। তাকে জয় করা কঠিন। ড. কামাল হোসেনের গণফোরামসহ বিএনপির বিজয়ী সদস্যরা সংসদে যোগ দিতে এক পায়ে খাড়া। বহিস্কারের হুমকি তাদের টলাতে পারেনি। বিএনপির জয়ী সদস্যরা এমন যুক্তিও দাঁড় করান যে, দলের চেয়ারপারসনের মুক্তির জন্যও তাদের সংসদে যোগ দেওয়া দরকার।
ছোট্ট একটি ভাঙনের মুখে বিএনপি। গুটিকয় সদস্যের থাকা না থাকা খুব বড় একটা সংকটের বিষয় নয়। আসল সংকট অন্যত্র। সংসদীয় রাজনীতির আদর্শে গঠিত রাজনৈতিক দল সংসদ বর্জন করে কতদিন তাদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে, কীভাবে তা সম্ভব? বড়সড় জনসমর্থনপুষ্ট নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তি না থাকলে দল টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে।
এটাই বিগত সময়ে বিএনপির বড় রাজনৈতিক সংকট, যেখানে শীর্ষ নেতাদের অনেকে নিষ্ফ্ক্রিয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে তাদের পক্ষেও রাজনৈতিক পেশা রক্ষা করতে পার্শ্বপরিবর্তন অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো কর্নেল অলির মতো দু’একজন নেতার পরিণাম দেখে তারা দলত্যাগ করেননি, সুসময়ের জন্য অপেক্ষা করেছেন। তাছাড়া ডাইনেস্টি-শাসন ও তারেক রহমানের ক্রমান্বয় ঊর্ধ্বগতির অবস্থান তাদের ক্ষুব্ধ করেছে; কিন্তু চেয়ারপারসনের দলীয় সমর্থন ও ব্যক্তিত্বের কারণে বিদ্রোহের পথ ধরেননি তারা।
দুই.
তারেক রহমানকে নিয়ে বিএনপির এ অভ্যন্তরীণ সংকট আজকের নয়। ক্ষমতাসীন অবস্থায় তা ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে বিপদে-আপদে, সংকটে-সমস্যায়। বিএনপির শীর্ষ নেতাদের গত কয়েক বছরের আচরণ বিশ্নেষণ করলে এমন সব সমস্যা-সংকটের বাস্তব ছায়াই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দমননীতির মুখে তারা ঐক্যবদ্ধ শক্তির দৃঢ়তা নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং জামায়াতের সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসীপনার ভুল নীতি অনুসরণ করে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও শক্তি দুর্বল করেছে, এই যা।
নির্বাচনের ফলাফল এবং তা নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, বিএনপি প্রত্যাখ্যাত নির্বাচনের বিবেচনায় সংসদে যোগ দেবে না। ভিন্ন ছিল না ড. কামাল হোসেনের প্রতিক্রিয়া। এরপর নানা বক্তব্যে, তর্কে-বিতর্কে অনেক পানি ঘোলা হলো। তবু বিএনপি পূর্বসিদ্ধান্তে অটল। বিশেষ করে মহাসচিব মির্জা ফখরুল।
শপথ গ্রহণে ইচ্ছুক নির্বাচনে জয়ী সদস্যদের উদ্দেশে কড়া ভাষায় সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাধিকবার। কিন্তু সংশ্নিষ্ট সদস্যদের মনোভাবে অন্তত এটুকু বোঝা যাচ্ছিল যে, তারা দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদে যোগ দেওয়ার লক্ষ্যে শপথ গ্রহণে মরিয়া। আওয়ামী লীগ তাদের নিয়ে নেপথ্যে কোনো তাস খেলেছে কি-না, তা অবশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। সিদ্ধান্তের দিকটা একপক্ষীয় বলেই অনেকে মনে করেন।
ঠিক এ সময়ে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো দৈনিক পত্রিকাগুলোতে শীর্ষ শিরোনাম, যার মর্মার্থ হলো- লন্ডন থেকে তারেক রহমানের প্রদত্ত নির্দেশে নির্বাচনে জয়ী বিএনপি সদস্যদের শপথ গ্রহণ। কিন্তু বিষয়টি এত সহজ-সরল যে নয়, তার প্রমাণ বগুড়ার আসন থেকে জয়ী মির্জা ফখরুল শপথ গ্রহণে অংশ নেননি। তার আসনটি যথারীতি শূন্য। সংসদে ফখরুলহীন বিএনপি- তাৎপর্যটি কী?
বেশ তোলপাড় সংবাদপত্র মহলে। একটি দৈনিকে যথারীতি মোটা হরফে শিরোনাম- ’তারেকের নির্দেশে ৪ এমপির শপথ’। ছোট হরফে লেখা- ’বিএনপির ডিগবাজি নিয়ে সমালোচনা, নেপথ্যে খালেদার মুক্তি!’ অন্য একটি দৈনিকে ভিন্নমাত্রিক শিরোনাম- ’খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে তারেকের একক সিদ্ধান্ত’। ’শপথ নিলেন আরও ৪ নেতা, ৫ বছর পর সংসদে বিএনপি’। অন্যত্র একই প্রশ্নে শিরোনাম- ’কৌশল করে আসন হারালেন ফখরুল’ এবং ’ফখরুলকে বাইরে রেখে সংসদে বিএনপি’। মে দিবসকে ঢেকে ফেলে দৈনিকগুলোতে তারেক-বিএনপির খবর নিয়ে মাতামাতি।
তাৎপর্যহীন নয় বিষয়টি। প্রথমত, বিএনপির বিজয়ী সদস্যরা বহিস্কারের হুমকি অগ্রাহ্য করে শপথ নিতে প্রস্তুত ছিলেন; দ্বিতীয়ত, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে; তৃতীয়ত, তারেক রহমান বাধ্যতামূলক স্বেচ্ছানির্বাসনে। তার প্রিয় নেতারা মামলায় কারাবন্দি। রাজধানী থেকে তৃণমূল স্তরে বিএনপি নেতাকর্মীরা হয় আটক, নয় দৌড়ে- এমনটাই সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর। তাই বলছিলাম, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েও সংকটে বিএনপি।
এ অবস্থায় সংসদ বর্জন কি বিএনপির পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল? শপথ না নিলে আসন শূন্য ঘোষিত হবে, সেখানে উপনির্বাচন হবে, তাতে বিএনপির বদলে অন্য কারও জয়ী হওয়াটাই স্বাভাবিক। আগেই বলা হয়েছে, এ অবস্থায় ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে তোলার পরিবেশ ও সক্ষমতা না থাকায় বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? হয়তো এসব ভাবনা নিয়ে মঞ্চে আবির্ভূত তারেক রহমান তার একক সিদ্ধান্ত নিয়ে। দেখা যাক, সংসদে যোগ দিয়ে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটানো যায় কি-না, কে বলতে পারে হঠাৎ কোনো ইস্যু সামনে এসে পড়বে কি-না? এসব ভাবনা হয়তো তারেকের মাথায় ছিল।
কিন্তু এ সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও ভয়ানক বিব্রত করেছে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের, যারা শপথ গ্রহণের বিপক্ষে ছিলেন। সেই পুরনো নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব। মহাসচিব বাইরে থেকে নিজের মান রক্ষা করলেন। এমনকি পূর্বসিদ্ধান্ত বেমালুম গিলে ফেলে সাংবাদিকদের জানালেন- এটা দলীয় সিদ্ধান্ত। তা কেউ বিশ্বাস করুন বা না-ই করুন। মুখ বাঁচানো বলে কথা। তারেক রহমানের ক্ষমতার দাপটকালেও বিএনপি এভাবেই চলেছে খালেদা জিয়ার নেপথ্য সম্মতিতে।
সংশ্নিষ্ট কয়েকটি প্রশ্ন :এরপর কি সত্যি খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন, তারেক কি নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরতে পারবেন? দ্বিতীয় প্রশ্নটির জবাব সম্ভবত নেতিবাচক। আরও প্রশ্ন :বিএনপি কি এমন ধারায়ই চলবে? নাকি অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ঘটবে মির্জা ফখরুলকে কেন্দ্র করে? এ ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা নেতিবাচক বলেই মনে হয়। তেমন নিঃস্বার্থ, সাহসী, বলিষ্ঠ, দলপ্রাণ নেতা বিএনপিতে কি আছে যে, পরিবারতন্ত্র উৎখাত করার মতো দলে জনপ্রিয়? এসব প্রশ্নের সমাধান না ঘটলে বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমান পথ ধরেই চলবে। আওয়ামী লীগ তার উন্নয়ন কর্মসূচি নিয়ে দেশ শাসন করবে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা নিয়ে- এটাই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা।
ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি
সূত্র:সমকাল