ঢাকাকে সিঙ্গাপুর বানানো হবে, গত কয়েক বছরে আমাদের মেয়ররা একথা বারবার বলেছেন। ঢাকার পাবলিক টয়লেটগুলো ফাইভ স্টার হোটেলের টয়লেটগুলোর মতো হয়ে গেছে, জানিয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র। অর্থমন্ত্রী বলছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ কানাডার সমান হয়ে যাবে। এক বছরের মধ্যে স্পেন, থাইল্যান্ডের সমান হয়ে যাবে।
বিস্ময়কর-কৌতূহল উদ্দীপক এসব সংবাদ জেনে, বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে উৎফুল্লচিত্তে আনন্দিত না হওয়ার কারণ দেখি না। কানাডায় যাওয়ার জন্যে বাংলাদেশের মানুষ দশ-পনেরো লাখ টাকা খরচ করতেও রাজি থাকে। সেখানে যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা কানাডার সমান হয়ে যায়, তার চেয়ে গর্বের আর কিছু হতে পারে না।



তো সে জন্যে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। আমরা সেই দিনের জন্যে অপেক্ষা করি আর কানাডাসহ বিশ্ব অর্থনীতির শক্তিশালী কিছু দেশের মানুষের আয়-ব্যয় তথা জীবনযাপন সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করে দেখি।

কানাডাসহ উন্নত দেশগুলো নাগরিকের নিত্য-প্রয়োজনীয় ও সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্যে অপরিহার্য উপাদানগুলোকে প্রায় মৌলিক অধিকারের সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মাংস, দুধ, ডিম- যাতে সব মানুষ নিয়মিত গ্রহণ করতে পারেন- সেদিকে নজর রাখে।

কানাডা, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো ধনী এবং পাশের দেশ ভারত এক্ষেত্রে কী করে, তা জানার চেষ্টা করে দেখি। তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি কেমন এবং কানাডার সমান হয়ে যাওয়ার পড়ে কেমন হবে বা হতে পারে, একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

প্রথমে বাংলাদেশের বাজারে এসব জিনিসের দাম ও মান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যাক।

বাংলাদেশে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৫২৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, প্রায় সবখানেই বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা বা তারও বেশি দামে। এক কেজি প্যাকেট দুধের দাম ৭০ টাকা। গরুর ফ্রেশ দুধ ৮০ থেকে ১০০ টাকা লিটার। এক ডজন ডিমের দাম ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা। বাংলাদেশে ন্যূনতম মজুরি মাসে (পোশাক শ্রমিক) ৮ হাজার টাকা। বিশ্ব ব্যাংকের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী গড় আয় ১ হাজার ৫০০ ডলার। বর্তমানে যা বলা হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ ডলার।



বিশ্ব অর্থনীতিতে যে কানাডার সমান অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জন করবে বাংলাদেশ, সেই কানাডার টরেন্টো থেকে লেখক-সাংবাদিক জসিম মল্লিক সূত্রে জানলাম, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৪ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা ২৫৬ টাকা। এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশি টাকায় ৮৫ টাকা।

কানাডার সর্বনিম্ন মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১৪ দশমিক ৮৫ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যা ৯৫০ টাকা, দিনে ৭ হাজার ৬০০ টাকা, মাসে ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় বিশ্বব্যাংকের ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪৫ হাজার ডলার।

নিউইয়র্ক থেকে সাংবাদিক নিহার সিদ্দিকী জানালেন, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৫০০ টাকা। ডিমের ডজন ১৬০ টাকা। এক লিটার সয়াবিন তেল ১০০ টাকা। দুধের লিটার ৬৫ টাকা। আমেরিকানদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৬০ হাজার ডলার।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে লেখক-সাংবাদিক আকিদুল ইসলাম জানালেন, সেখানে এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশি টাকায় ৬১ টাকা। এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৪৮৮ টাকা। ডিমের ডজন ২৪৪ টাকা। ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ২৫ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ৫২৫ টাকা। দিনে ১২ হাজার টাকা, মাসে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি। অস্ট্রেলিয়ানদের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৪ হাজার ডলার।

ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ সুইজারল্যান্ড থেকে সাংবাদিক বাকি উল্লাহ জানালেন, সেখানে এক কেজি গরুর মাংসের দাম ৬০০ টাকা। ৫০ থেকে ৬৫ টাকা এক লিটার দুধের দাম। এক ডজন ডিমের দাম ১৮০ টাকা। সুইজারল্যান্ড সীমান্ত পার হয়ে জার্মানিতে ঢুকলে সব জিনিসের দাম অর্ধেক। সুইজারল্যান্ডের ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৮ দশমিক ১ ফ্রাঙ্ক, যা বাংলাদেশি টাকায় ৬৬৫ টাকা; দিনে ৫ হাজার ৩২০ টাকা, মাসে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৮০ হাজার ডলার।

জার্মানির অভিজাত শহর বন থেকে রূপচর্চা বিশেষজ্ঞ রোজী ভূঁইয়া জানালেন, সেখানে এক লিটার দুধের দাম বাংলাদেশের হিসাবে ৬০ টাকা। এক ডজন ডিম ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। রান্নার তেল ৯০ থেকে ৯৫ টাকা লিটার। জার্মানির মাথাপিছু আয় প্রায় ৪৭ হাজার ডলার।

লন্ডন থেকে সাংবাদিক শেখ মোহিতুর রহমান বাবলু’র সূত্রে জানলাম, গরুর মাংসের কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এক ডজন ডিম ৯০ টাকা। রান্নার তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা লিটার। দুধের লিটার ৯০ টাকা। ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৯০০ টাকা; দিনে ৭ হাজার ২০০ টাকা। মাসে ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার।

ইতালির ভেনিস থেকে সাংবাদিক পলাশ রহমান জানালেন, গরুর মাংসের কেজি ৫৫০ টাকা। এক লিটার দুধ ৫০ টাকা। ডিমের ডজন ১২০ টাকা। তেল ১০০ থেকে ১১০ টাকা লিটার। দেশটির মাথাপিছু আয় প্রায় ৩২ হাজার ডলার।

পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল শহর এশিয়ার উন্নত দেশ জাপানের টোকিও। সেখান থেকে সাংবাদিক রাহমান মনি জানালেন, গরুর মাংসের কেজি ১ হাজার ২০০ টাকা। ডিমের ডজন ২০০ টাকা, দুধের লিটার ২০০ টাকা। ন্যূনতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ১ হাজার ২০০ টাকা; দিনে ৯ হাজার ৬০০ টাকা, মাসে ২ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। মাথাপিছু আয় প্রায় ৪০ হাজার ডলার।

এশিয়ার আরেক উন্নত দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল থেকে আইটি ব্যবসায়ী এমএন ইসলাম জানালেন, ডিমের ডজন ৯৫ টাকা, গরুর মাংস ৭৫০ টাকা কেজি, খাসির মাংস ৭১৫ টাকা কেজি, দুধের লিটার ১১৫ টাকা। মাসে একজন শ্রমিকের ন্যূনতম আয় ২ লাখ টাকার উপরে।

এশিয়ার আরেক ধনী দেশ সিঙ্গাপুর থেকে ব্যবসায়ী মাসুদুর রহমান জানালেন, সিঙ্গাপুরে তো প্রায় সব জিনিসই আমদানি করা। এখানে ফ্রোজেন গরুর মাংসের কেজি ৫৫৮ টাকা। এক ডজন ডিম ১০৮ টাকা। ন্যূনতম মজুরি দিনে ৪ হাজার এবং মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সিঙ্গাপুরের মাথাপিছু আয় প্রায় ৫৮ হাজার ডলার।

পাশের দেশ ভারতের চিত্রটা দেখে নেওয়া যাক। কলকাতা থেকে সাংবাদিক প্রতীম রঞ্জন বোস জানালেন, বাংলাদেশি টাকায় এক ডজন ডিমের দাম ৬০ টাকা। দুধের লিটার ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। গরুর মাংসের কেজি ২১০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি, খাসির মাংস ৭০০ থেকে ৭২০ টাকা কেজি। চাল ৪২ থেকে ৫০ টাকা কেজি। ভারতের ন্যূনতম মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। মাথাপিছু আয় প্রায় ২ হাজার ডলার।

কানাডার একজন শ্রমিক ঘণ্টায় আয় করেন ৭ হাজার ৬০০ টাকা, বাংলাদেশি শ্রমিকের ঘণ্টায় আয় ৩৩ টাকা, দিনে ২৬৭ টাকা। ঢাকার বাজারে এক কেজি পটলের দাম ৮০ টাকা।

কানাডার শ্রমিক দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করে মাসে আয় করেন ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বাংলাদেশের শ্রমিকের মাসে আয় ৮ হাজার টাকা। তিনি দুই দিনের আয় দিয়েও এক কেজি গরুর মাংস কিনতে পারেন না। কৃষক এক মন ধান বিক্রির টাকা দিয়ে এক কেজি গরুর মাংস কিনতে পারেন না।

কানাডার শ্রমিক এক মাসের আয় দিয়ে একটি গাড়ি কিনতে পারেন।

মাংস, ডিম, দুধ খেতে না পারায় বাংলাদেশে অপরিণত শিশু জন্মহার সবচেয়ে বেশি- এ তথ্য জানিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। আয় এবং প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যে সমঞ্জস্য না থাকায় বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের সুস্থ-স্বাভাবিক মেধা বিকশিত হচ্ছে না। ভারতও মাংস, ডিম, দুধের দাম ক্রয় সীমার মধ্যে রেখেছে। চালের দামও ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি।

উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এমনকী, ভারতেও পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন নেই। বাংলাদেশে মানসম্পন্ন পণ্য পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

কয়েকটি প্রশ্ন ও প্রত্যাশা।

বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখার সূচকে বাংলাদেশ যেদিন কানাডার সমান হবে, সেদিন শ্রমিকের বেতন ২ লাখ ২৮ হাজার টাকা হবে? গরুর মাংসের কেজি ২৫৬ টাকা হবে? সব মানুষ ডিম, দুধ, সবজি, ভাত খেতে পারবেন? ভূমধ্যসাগরের বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া বন্ধ হবে? ধানের মূল্য না পাওয়ায় কৃষকের আহাজারি বন্ধ হবে?

দাম এবং বৈষম্যে কানাডা বা ইউরোপের সমান নয়, বাংলাদেশ পৃথিবীর প্রায় সব দেশকে ছাড়িয়ে গেছে। সরকারের নীতি নির্ধারকরা প্রতিদিন কয়েকবার করে বলছেন, বাংলাদেশ এখন পৃথিবীর রোল মডেল। রোল মডেল বাংলাদেশ, কানাডা-স্পেন বা থাইল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যাবে! দেশের মানুষের ১৯শ ডলারের মাথাপিছু আয়, ৪৫ হাজার ডলার হয়ে যাবে, অপেক্ষা তো মাত্র কয়েক বছরের!


সূত্র:আমাদের সময়