বরগুনায় প্রকাশ্য সড়কে স্ত্রীর সামনে রিফাত শরীফকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার অন্যতম প্রধান আসামি সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড মঙ্গলবার ভোরে পুলিশের সঙ্গে \’বন্দুকযুদ্ধে\’ নিহত হন। এ খবর প্রকাশ হবার পর থেকেই তা ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর পর থেকেই আনন্দদের বন্যায় ভাসতে থাকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। এ বিষয় আনিসুর রহমান নামের একজন সাংবাদিক ফেসবুকে তার বিশ্লেষনধর্মি মতামত প্রকাশ করে।
পাঠকদের উদ্দেশ্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো:-

বাহ! কী সুন্দর সকাল। ঘুম থেকে জেগে মোবাইল হাতে নিয়ে প্রথম যে খবরটি পেলাম সেটি হলো নয়ন বন্ড খতম। সে দিনদুপুরে শতশত মানুষকে সাক্ষী রেখে স্ত্রী মিন্নির সামনে তার স্বামী রিফাতকে যেভাবে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করলো তার বিচার দেখার অপেক্ষায় ছিল গোটা জাতি।

তবে তাকে ধরে রিমান্ডে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করার আগেই রাতের অন্ধকারে এই ক্রসফায়ারটিও আমি সমর্থন করতে পারলাম না। কারণ তাকে রিমান্ডে নিলে আরো বড় বড় অপরাধীর নাম বেরিয়ে আসতো। অনেক বিস্ময়কর তথ্য বেরিয়ে আসতো। মিন্নিকে বিয়ের যে কাবিননামা গণমাধ্যমে প্রকাশ হলো, তার রহস্যসহ নানা অপকর্মে জড়িত ব্যক্তির নাম এবং কার আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে সে এলাকায় রাজত্ব কায়েম করেছিল, কার নির্দেশে যেকোনো মামলায় তার জামিন হয়ে যেত! কোন খুঁটির জোরে দিনদুপুরে শতশত মানুষের সামনে নির্ভয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারলো- রিমান্ডে নিলে এমন অনেক জিজ্ঞাসার জবাব মিলতো, বেরিয়ে আসতো চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। দেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হতো, নয়নরা সমাজে নিজে নিজে তৈরি হয় নাকি তাদেরকে কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে ধীরে ধীরে বড় সন্ত্রাসী বানায়। রিফাতকে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সাংবাদিক ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মহল তৎপর হয়ে উঠে। অনুসন্ধানী রিপোর্টে বেরিয়ে আসতে শুরু করে নয়নদের গডফাদারদের নাম। ইতোমধ্যে তাদের নামসহ দৈনিক কালের কণ্ঠ প্রথম পৃষ্ঠায় বিশাল নিউজ পাবলিশ করেছে। সেখানে উঠে এসেছে নয়নদের অপরাধের চিত্র, কিভাবে এলাকাটি হয়ে উঠেছিল তাদের অভয়ারণ্য। কিভাবে, কার আনুকুল্যে তারা বারবার জেল থেকে জামিনে বেরিয়ে আসতো। কার ছত্রছায়ায় তারা লালিত-পালিত হতো। যাক, ওই দিকে না হয় আজ নাই গেলাম।


এদিকে আমার এই উদ্বেগ বা ধারণা যে যথার্থ, তার বড় প্রমাণ হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য। তিনি আজ দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সম্প্রীতি বাংলাদেশ আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, \"আমাদের পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী, আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী তার (নয়ন) পিছু নিয়ে সর্বক্ষণ চেষ্টা করছিল তাকে ধরার জন্য। কিন্তু ধরার শেষ মুহূর্তে সে অবস্থান চেঞ্জ করছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে কেন গুলিবিনিময় করতে হয়েছিল সেটি না জেনে কিছু বলতে পারবো না। তিনি বলেন, পুলিশ নিজের নিরাপত্তায় জীবন বাঁচানোর জন্য হয়তো এটি করেছে। এ বিষয়ে আমাকে আরও জানতে হবে। তিনি আরও বলেন, নয়ন বন্ড বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলেও বাকিদের জীবিত অবস্থায় ধরা হয়েছে। আমরা ইনকোয়ারি করার পর এ ঘটনায় আরও কারা জড়িত ছিল সবই আপনারা জানতে পারবেন। এ ঘটনায় প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলে নিশ্চয়ই তাকেও বের করব।\" -স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন বক্তব্য প্রমাণ করে, নয়নের মতো এত বড় একজন অপরাধীকে না ধরে, রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ না করে এভাবে ক্রসফায়ার দিয়ে রাতের আঁধারে ক্রসফায়ার দেওয়া উচিত হয়নি। তার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট। কারণ তিনি খুব ভালো জানেন, এমনটি দেশের মানুষের কাছে কাঙ্ক্ষিত নয়। দেশের মানুষ চায় অপরাধী যারা সৃষ্টি করে তাদের বিচার। সমাজ থেকে অন্যায়-অপরাধ দূর করতে হলে এর মূলসহ উৎপাটন করতে হবে। না হয় একজন অপরাধীকে ক্রসফায়ার দিয়ে দুনিয়া ছাড়া করা গেলেও সামজে অপরাধী জন্ম নেওয়া বা এর বিস্তৃতি বন্ধ হবে না।

তবে প্রতিটি মানুষ দুর্ধ্বর্ষ খুনি ও বহু অপকর্মের সঙ্গে জড়িত এই নয়ন বন্ডের প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে এতে কোনো দ্বিমত নেই। নয়ন ছিল বহু অপরাধের সাক্ষী!

সকালে দেখলাম, নয়নের ক্রসফায়ারে খবরে অনেক মানুষ ফেসবুকে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন নয়নের ক্রসফায়ার অনেক কিছু চাপা পড়ে গেলেও আমরা খুশি। কারণ, গ্রেফতার করে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার করতে গেলে আইনের ফাঁক-ফোকরে বা কারো দয়ায় সে আগের মতোই ছাড়া পেয়ে যেত। বিচার হতো না। ক্রসফায়ারে অন্তত একটা খুনি তো কমলো! অনেকেই তুলে ধরেছেন বিশ্বজিৎ রায়কে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার কথা। তারা বলছেন, বিশ্বজিৎকেও তো প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে। মামলা হয়েছে, অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন, কিন্তু তাদের বিচার কি হয়েছে?

আমি যখন সকালে বাসে করে অফিসে আসছিলাম, তখনও নয়ন বন্ডের ক্রসফায়ার নিয়ে কথা ওঠে যাত্রীদের মাঝে। প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে বিশ্বজিৎ হত্যার কথাও। কেউ কেউ বলছেন, গ্রেফতার করে লাভ নাই। বিশ্বজিৎকেও তো প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়েছে শতশত মানুষের সামনে। কই? বিচার হয়েছে?? এর উত্তর ছিল না কারো কাছেই।

আমি মনে মনে দুঃখ করে বলি, হায় বিচার ব্যবস্থা তুমি এমন কেন? তোমার প্রতি কেন মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না, কেন বারবার হতাশ হয়। কেন বিশ্বজিৎ হত্যার বিচার থেমে যায় লাল ফিতার জালে, কেন সাগর-রুনি, চট্টগ্রামের মিতু, কুমিল্লার তনুসহ অসংখ্য হত্যাকাণ্ডের বিচারের বাণি নিভৃতে কাঁদে!?