বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতি একেবারেই নাজুক। দেশে এখন প্রতিনিয়তই করোনার রোগীদের সংখ্যা বেড়ে দাড়াচ্ছে আগের দিনের থেকে বেশি। আর শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বেরই প্রায় এই একই অবস্থা। করোনার কারনে নাজেহাল হয়ে আছে বিশ্বের অন্যান্য সব উন্নত দেশ গুলোও। তবে বিশ্বের অন্যান্য দেশের করোনার সংক্রমণ ঠেকানোর উপায় আর আমাদের দেশের করোনা ঠেকানোর উপায় বেশ আলদা। বিশেষ করে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকান্ড থেকে মন্ত্রীর সবারই অন্যরকম অবস্থা। এই যেমন নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডেভিড ক্লার্ক কোভিড–১৯ মহামারি মোকাবিলার সময় লকডাউনের মধ্যে সপরিবার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে গিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে পদত্যাগ করেছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, কোভিড–১৯ মোকাবিলায় যে কটি দেশ সফলতা দেখিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে নিউজিল্যান্ড শীর্ষস্থানীয়। দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৫২৮ জন এবং মা’/রা গেছেন ২২ জন। বাংলাদেশে কোনো ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায় নিয়ে কোনো দিন কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করেননি। পরিস্থিতি যত নাজুকই হোক না কেন, আমাদের মন্ত্রীরা কখনো ব্যর্থ হন না।

গত ৩০ জুন বাজেট নিয়ে আলোচনাকালে বিরোধী দলের কয়েকজন সাংসদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দুর্বলতা, অনিয়ম, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত তিন মাসে কোভিড–১৯ মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফিরিস্তি দেন। সরকার কোথায় কতটি নতুন হাসপাতাল করেছে, শয্যাসংখ্যা কত বাড়িয়েছে, নতুন করে কত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দিয়েছে, তারও বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন তিনি। মন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন, করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবায় কোনো ঘাটতি নেই।

কিন্তু এরপর স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে কথাটি বললেন, তাতে আক্কেলগুড়ুম। বিরোধী দলের সাংসদেরা, আইসিইউ ও ভেন্টিলেটরের ঘাটতি এবং কোভিড–১৯ পরীক্ষার অপ্রতুলতা নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন। এর জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ’আইসিইউ নিয়ে অনেক কথা হলো। ভেন্টিলেটর নিয়ে বিরাট হইচই। কিন্তু দেখা গেছে, ভেন্টিলেটরের কোনো প্রয়োজনই নেই। ভেন্টিলেটরে যাঁরা গেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই মৃ’/ত্যু’/ব’/র’/ ণ করেছেন। আমাদের ৪০০ ভেন্টিলেটর আছে। এর মধ্যে ৫০টিও ব্যবহার হয়নি। সাড়ে ৩০০ ভেন্টিলেটর খালি পড়ে আছে। কারণ, তখন মানুষ এটা জানত না।’

ভেন্টিলেটরের কোনো প্রয়োজন নেই—একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলতে পারেন? তাঁর এ বক্তব্যে আমরা স্তম্ভিত হয়েছি। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, যেসব রোগী ভেন্টিলেটর ব্যবহার করেছেন, তাঁদের প্রায় সবাই মারা গেছেন। মন্ত্রীর যুক্তি মেনে নিলে হাসপাতালও তুলে দিতে হয়। কেননা হাসপাতালে যত রোগী ভর্তি হয়, তাদের সবাই বাঁচে না। বাজারে প্রাপ্ত ওষুধেও সব রোগ সারে না। মন্ত্রীর যুক্তি মেনে নিলে ওষুধ উৎপাদনও বন্ধ করে দিতে হয়। আইসিইউতে যত রোগী চিকিৎসা নেয়, সবাই বাঁচে না। মন্ত্রীর যুক্তি মেনে নিলে আইসিইউও তুলে দিতে হয়। মন্ত্রীর যুক্তি মেনে নিলে বৃদ্ধদেরও আর করোনা চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। কেননা চিকিৎসার পরও তাঁদের বেশির ভাগ মারা যান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিশ্চয়ই জানেন যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামে ব্যবসায়ী দুই ভাই একই সময়ে একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের দুজনেরই ভেন্টিলেটর সুবিধা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু হাসপাতালে ভেন্টিলেটর ছিল একটি। যে ব্যবসায়ী ভেন্টিলেটর ব্যবহারের সুযোগ পাননি, তিনি মা’/রা গেছেন বলে পত্রিকায় খবর এসেছিল। ভেন্টিলেটর ব্যবহার করে কতজন মা’/রা গেছেন বা কতজন বেঁচে গেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সেই হিসাব নেওয়ার কথা নয়। তাঁর হিসাব নেওয়ার কথা রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ভেন্টিলেটর আছে কি না। রোগীরা হাসপাতালে গিয়ে যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, তাঁরা কাজ করেছেন বলে দেশে করোনায় মৃত্যুর হার অনেক কম। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে অনেক বেশি রোগী মা’/রা গেছেন। তুলনায় বাংলাদেশে অনেক কম মা’/রা গেছেন। মন্ত্রী আরেকটি কথা বলেছেন, কোটি কোটি মানুষকে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু রোগ পরীক্ষায় বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে আছে, সেই প্রশ্নের উত্তর দেননি। ভাইরাসটির সামাজিক সংক্রমণ ঠেকাতে তাঁরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেননি। কেননা মার্চে রোগ শনাক্ত হওয়ার পর বিদেশফেরত প্রত্যেক নাগরিকের কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন নিশ্চিত করা গেলে সামাজিক সংক্রমণ কমানো যেত। তখন আর কোটি কোটি মানুষকে পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতো না। এখন কার শরীরে সংক্রমণ হয়েছে, কার শরীরে হয়নি, তা জানার উপায় হলো পরীক্ষা। মন্ত্রী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ’স্ববিরোধিতা’ নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু তিনি বলেননি যে তারা শুরু থেকে পরীক্ষার ওপরই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।

গত ১৫ জুন প্রথম আলোয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দপ্তরে অনুপস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, তিনি কর্মস্থলে শেষ কবে গিয়েছিলেন, তা চট করে বলতে পারেননি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অফিস চলাকালে পরপর তিন দিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘুরে তেমন কোনো কর্মতৎপরতা দেখা যায়নি। এখন সেখানে গুটি কয় কর্মকর্তা-কর্মচারী, লিফটম্যান ছাড়া কাউকে চোখে পড়ে না।

দপ্তরে অনুপস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী বলেন, তিনি বাসায় বসেই সব কাজ করেন। কাজ করতে তাঁকে অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। মন্ত্রী যেখানে থাকেন, সেটাই তাঁর অফিস। তবে প্রথম আলোর খবর প্রকাশিত হওয়ার পরদিনই তিনি দপ্তরে গেছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথাও বলেন।

এর আগে আওয়ামী লীগের সাংসদ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী ফেসবুকে লেখেন, ’স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কে চালাচ্ছে? আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এটা একটা আজগুবি বিভাগ বা মন্ত্রণালয়। এই বিভাগের কোনো আগা নেই, মাথা নেই।’

কথাটি বিরোধী দলের কেউ কিংবা সংবাদমাধ্যম বললে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ঠুকে দেওয়া হতো। অনেকের বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে। সরকারি দলের সাংসদ বলে তিনি বেঁচে গেছেন। সংবাদমাধ্যমগুলো শুধু দুঃসংবাদ ও নেতিবাচক খবর বেশি প্রচার করে বলে অভিযোগ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এতে নাকি বয়স্ক, তরুণ সব ধরনের মানুষ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আসলে মানুষ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমের নেতিবাচক খবরের জন্য নয়। বরং মিডিয়ায় খবরগুলো আসছে বলে রোগীরা কিছুটা চিকিৎসা পাচ্ছে। মানুষ অসুস্থ হয়, যখন দেখে রোগী তিন-চার হাসপাতাল ঘুরেও ভর্তি হতে না পেরে বাড়ি চলে যাচ্ছে। মানুষ অসুস্থ হয়, যখন দেখে করোনা পরীক্ষা করতে এসে রোগী রাস্তাতেই মারা যাচ্ছে। মানুষ অসুস্থ হয়, যখন দেখে হাসপাতালে ভর্তি করার পর আইসিইউ না থাকার কারণে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। একজন সাবেক ব্যাংকার ও তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তাঁদের প্রকৌশলী সন্তান কীভাবে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন, সে দৃশ্য মন্ত্রীর চোখ এড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু দেশবাসী দেখেছে। তাঁরা পাঁচটি হাসপাতালে গিয়েও চিকিৎসা পাননি। এর আগে ঢাকার একটি নামকরা হাসপাতালের কর্মকর্তা ফেসবুকে লিখেছেন, ’আমি আমার মায়ের মৃ’/ত্যু’/ তে শোকাহত নই, ক্ষুব্ধ।’

আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, ’পাঁচ মাস কিন্তু আমরাই মাঠে আছি। প্রতিটি হাসপাতালে যে আমরা যাইনি, এ কথাটা সঠিক নয়। বসুন্ধরা কীভাবে বানিয়েছি। ২৫ দিনে বসুন্ধরা আইসোলেশন সেন্টার, হাসপাতাল করা হয়েছে। যেখানে দুই হাজার বেড আছে। যতগুলো কোভিড সেন্টার রয়েছে, সব কটি উদ্বোধন করেছি। চিকিৎসক-নার্স আমরা যাঁরা কাজ করি, তাঁদের অনুপ্রাণিত করলে তাঁরা আরও কাজ ভালো করবেন। ৫০ জন চিকিৎসক-নার্স মারা গেছেন। সব সময়ই যদি সমালোচনা করি, তাহলে সঠিক হবে না।’

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এসব কথাবার্তায় আমরা অবাক হইনি। গত বছর যখন সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তিনি সপরিবার মালয়েশিয়া সফর করেছিলেন। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি। তখন বলা হয়েছিল, মশা মারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নয়। এটি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব। এবার কোভিড–১৯ মোকাবিলার দায়িত্ব যে মন্ত্রী কিংবা তাঁর মন্ত্রণালয় অন্য কারও ওপর চাপাননি, সে জন্য তঁাদের ধন্যবাদ জানাতে হয়। অন্তত করোনার কারণে হলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অস্তিত্ব জনগণ জানতে পেরেছে।

মন্ত্রী মহোদয় সংসদে ও সংসদের বাইরে উত্থাপিত অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু কী কারণে কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালের পাঁচজন চিকিৎসককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল, কী কারণে মুগদা হাসপাতালের পরিচালককে রাতারাতি বদলি করা হয়েছে, সেসব প্রশ্নের জবাব আজও পাওয়া যায়নি।


এ দিকে দেশে এখন করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ছুই ছুই। জানা গেছে গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে করোনা রোগীর সনাক্ত হয়েছে সারা দেশ ব্যাপি প্রায় ৩ হাজার ৩ জনেরও অধিক। আর সেই সাথে প্রাণহানীর সংখ্যা হয়েছে ২৯ জন। এ নিয়ে দেশে প্রাণহানীর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেল ২ হাজারের বেশি। বর্তমানে দেশে করোনার প্রকোপ আগের থেকে অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে। আর এই সংখ্যা কবে নাগাদ কমবে তা জানা নেই কারোর।