বাংলাদেশের এক সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা এবং মেয়র জনাব সাদেক হোসেন খোকা। যিনি ছিলেন রাজধানি ঢাকার অবিভক্ত মেয়র। গেল বছর এই দিনে সবাইকে কাদিয়ে না ফেরার দেশে। আর তার এই চলে যাওয়ার এক বছরে তাকে নিয়ে স্মৃতি চারন করছেন অনেকেই। আর সেই তালিকায় রয়েছেন রাশেদ খান মেননের মত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সাদেক হোসেন খোকাকে নিয়ে লেখা তার সেই লেখনি তুলে ধরা হলো হুবহু:-
সাদেক হোসেন খোকার মৃ’/ত্যু’/র’/ এক বছর পূর্তি হলো। মৃ’/ত্যু’/র’/ পর সবাই স্মৃতি হয়ে যায়। আবার কারও কারও স্মৃতি মানুষের মনে অমলিন থাকে। সাদেক হোসেন খোকা সেভাবেই আমার মনে উজ্জ্বল হয়ে আছে। একজন রাজনীতিক হিসেবে নন, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সাহসী কর্মী হিসেবে ও সর্বোপরি আমার এক প্রিয় ছোট ভাই হিসেবে। খোকার কাছেও আমি বড় ভাইয়ের মতো ছিলাম। আসলে এটা ছিল রাজনীতিতে আমাদের বেড়ে ওঠার সময়কালের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। মওলানা ভাসানী যেমন, তেমনি বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন উঠে গেছে। এখন রাজনীতির বিরুদ্ধ মতকে যেমন সামান্যতম সহ্য করা হয় না, তেমনি রাজনীতিকদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কও নেই।

খোকাকে আমি ঘনিষ্ঠভাবে জানি তার ছাত্রাবস্থা থেকে। সম্ভবত উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর জেল থেকে বেরিয়ে এসে তার সঙ্গে বিশেষ পরিচয় হয়। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানকালে খোকা আমাদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। গোপীবাগ অঞ্চলে তিনি ছাত্র ইউনিয়নকে (মেনন গ্রুপ) শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের ১ মের সম্মেলনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন গ্রুপ) ’পূর্ব বাংলা বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন’ হিসেবে নতুন নামকরণ হয়। ঢাকা মহানগর বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের বাছাই করা কর্মীদের নিয়ে গোপন গেরিলা স্কোয়াড গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। সেই অনুযায়ী খোকার ওপর দায়িত্ব পড়ে গোপীবাগে গেরিলা স্কোয়াড গড়ে তোলার। এ ছাড়া এসব গেরিলা স্কোয়াডকে দিয়ে বোমা বানানো ও অস্ত্র সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। খোকা এ ব্যাপারে বিশেষ যোগ্যতার পরিচয় দেন।

একাত্তরে সাতই মার্চ পেরিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি এ অভিমতে উপনীত হয়েছে মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনায় কোন মীমাংসা হবে না। এটাও স্থির হয় যে আমি ও কাজী জাফর- যাদের ইতোমধ্যে সামরিক আদালতে সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং আত্মগোপনে কাজ করছি তারা পল্টন জনসভায় প্রকাশ্য হব। খোকার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল আমাকে নরসিংদীর শিবপুর যেটা আমাদের প্রধান ঘাঁটি অঞ্চল ছিল, সেখান থেকে আমাকে ঢাকায় নিয়ে এসে পল্টনে জনসভায় পৌঁছে দেওয়া। খোকা আমাকে শিবপুর থেকে নিয়ে আসার জন্য কোত্থেকে একটা জিপ জোগাড় করে ছিল। এখনও মনে আছে জিপটা মাঝেমধ্যে থেমে যেত এবং আমাকে নেমে ঠেলতে হতো। এভাবেই ঢাকার পল্টনে পৌঁছে সেদিন প্রায় দু’লাখ লোকের জনসভায় বক্তৃতা করেছিলাম। তখনও জানতাম না যে ওই রাতেই ’অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হবে। খোকারা ওই অপারেশন সার্চলাইটের পর অন্য বন্ধুদের নিয়ে আগরতলা যান এবং সেখানে ’মেলাঘর ট্রেনিং ক্যাম্প’-এ কর্নেল হায়দারের অধীনে ট্রেনিং নেন। ট্রেনিং শেষে খোকাকে একটি গ্রুপের ডেপুটি কমান্ডার করে ঢাকায় পাঠানো হয়। তার কমান্ডার ঢাকায় পৌঁছে ছুটি নিয়ে বাড়িতে গিয়ে আর ফিরে না আসায় খোকা গেরিলা গ্রুপের কমান্ডার হন।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর খোকা একটু একটু করে নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়া শুরু করেন। বাদ সাধল ’৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার হলেও তার শাসনের আঘাত এসে পড়ল মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। অ’/স্ত্র’/ উদ্ধারের নামে তাদের বাড়ি বাড়ি সার্চ শুরু হলো। একদিন গোপীবাগের এক বড় ভাই হন্তদন্ত হয়ে আমাকে খবর দিল খোকাকে সেনাবাহিনীর লোকেরা ধরে নিয়ে গেছে। অ’/স্ত্রে’/র’/ সন্ধান চেয়ে ক্যান্টনমেন্টে তার ওপর টর্চার হচ্ছে। এর বিশেষ কারণ ছিল, খোকা ২নং সেক্টরের যোদ্ধা ছিলেন। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে ২নং সেক্টরের কমান্ডার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল হায়দার ইতোমধ্যে নিহত হয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধের কারণে সে সময় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদস্থ অফিসারকে আমরা চিনতাম ও মুক্তিযুদ্ধকালে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। তবে ইতোমধ্যে পাকিস্তান ফেরত সেনা কর্মকর্তারা মূল জায়গাগুলোতে বসতে শুরু করেছে। তারপরও ক্যান্টনমেন্টের সঙ্গে সম্পর্কের সূত্র ধরে খোকাকে মুক্ত করার চেষ্টা করলাম। নিদেনপক্ষে ট’/র্চা’/র’/ যাতে বন্ধ হয় তার চেষ্টাও একইসঙ্গে করছিলাম। সৌভাগ্যবশত দু’দিন, কী তিন দিনের মাথায় খোকা মুক্তি পেয়েছিলেন। এরপর খোকা রাজনৈতিকভাবে কিছুটা নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তবে এলাকার মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তার। সেই সূত্র ধরে সম্ভবত ১৯৭৯-এর ঢাকা পৌরসভা নির্বাচনে তিনি গোপীবাগ এলাকা থেকে কমিশনার নির্বাচিত হন। ইতোমধ্যে জিয়াউর রহমান প্রথমে জাগদল, পরে জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট ও পরে বিএনপি গঠন করেন। আমার সেজো ভাই এনায়েতুল্লাহ খান জিয়ার উপদেষ্টা। তার সূত্র ধরে খোকাও জিয়ার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

জিয়াউর রহমান নি’/হ’/ত’/ হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবির্ভূত হন জেনারেল এরশাদ। বিএনপির বিশাল অংশ জেনারেল এরশাদের সঙ্গে যোগ দিলেও মান্নান ভূঁইয়া, নোমান, খোকারা বিএনপিতেই রয়ে গিয়েছিলেন। এরশাদের আট বছরের শাসনের প্রায় সবটা সময়ই এ আন্দোলন চলে এবং বিএনপির ঢাকা মহানগরীর একজন নেতা হিসেবে খোকা মাঠে অসম সাহসী সব লড়াইয়ে ছিলেন। এরশাদবিরোধী এই লড়াই তাকে ঢাকা মহানগরের বিশেষ জনপ্রিয়তা এনে দেয়।

১৯৯১-এর সংসদ নির্বাচনে খোকা নির্বাচিত হন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলে খোকা তার সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হন। জামায়াতের সঙ্গে সখ্যের কারণে বিএনপি মধ্য-ডান অবস্থান থেকে আরও ডানে হেলে যায়। মুক্তিযোদ্ধা খোকা-মান্নান ভূঁইয়ার পক্ষে সেটা মেনে নেওয়া কষ্ট ছিল। তাদের আবার খালেদা জিয়ার প্রতি আনুগত্য ছিল প্রবল।

তবে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে খোকার সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সব সময়ই ছিল। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আমার প্রতি একটু বিশেষ উদার ছিলেন তিনি। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি ’সাফ গেমস’-এর আয়োজন করলে আমাকে তার সঙ্গে যুক্ত করেন। বিরানব্বইয়ে যখন আমি গুলিবিদ্ধ হই তখন সিএমএইচে আমার অপারেশন চলাকালীন অবস্থায় সারা রাত সিএমএইচের সিঁড়িতে বসে ছিলেন তিনি।
মেয়র থাকা অবস্থায় খোকা কয়টি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার, ভাষাসংগ্রামী ও পাকিস্তান আমলের ছাত্র আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সংগ্রামীদের নামে ঢাকা মহানগরের রাস্তাসমূহের নামকরণ। আমার সৌভাগ্য যে খোকা ঢাকার নিউ ইস্কাটনের রাস্তাটি আমার নামে ’রাশেদ খান মেনন সড়ক’ হিসেবে নামকরণ করেন। তার অবশ্য একটা দুঃখ রয়ে গিয়েছিল যে তিনি জেনারেল খালেদ মোশাররফের নামে কোনো রাস্তার নামকরণ করতে পারেননি। কারণ জিয়া পরিবারের বিরোধিতা।
দ্বিতীয় যে উদ্যোগটি তিনি নেন তা হলো ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে ১৭ সেপ্টেম্বর পুলিশের গুলিতে হাইকোর্টের মোড়ে যেখানে ওয়াজিউল্লাহ, বাবুল-রুস্তম শহীদ হন সেখানে যে গোল চত্বরটি রয়েছে সেখানে ওই শিক্ষা আন্দোলনের স্মারক স্থাপন এবং ওই চত্বরটিকে ’শিক্ষা চত্বর’ হিসেবে নামকরণ করা। এই নামকরণের কী হতে পারে সে ব্যাপারে খোকা আমার পরামর্শ চেয়েছিলেন। আমি কয়েকটি নামের মধ্যে ওই চত্বরকে ’শিক্ষা চত্বর’ হিসেবে নামকরণ করতে বলি এবং সেভাবেই ওই চত্বরকে ’শিক্ষা চত্বর’ নাম দেন। প্রতি বছর ছাত্র সংগঠনগুলো ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এ ’শিক্ষা চত্বর’-এ পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে।

লেখনির শেষ পর্যায়ে রাশেদ খান মেনন লিখেছেন শেষ জীবনে খোকার করুণতার কথা। বিদেশের মাটিতে চিকিৎসা করাতে করাতেই চলে গেলেন তিনি। তার দেশে ফেরার ইচ্ছে থাকলেও রাজনৈতিক সমীকরনের জাতা কলে পড়ে তিনি ফিরতে পারেননি দেশে। শেষে তিনি লিখেছেন মানুষের অনেক ভালোবাসা নিয়ে তিনি সমাহিত হয়েছেন তার প্রিয় মাতৃভূমিতে। ঢাকাবাসীর কাছে তার স্মৃতি সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে।