ক্যারিবীয় বোলিং দানব,নাম:অ্যান্ডি রবার্টস পুরো নাম,স্যার অ্যান্ডারসন মন্টগোমারি এভারটন।তাঁকে ’আধুনিক ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফাস্ট বোলিংয়ের জনকরূপে’ গণ্য করা হয়।২০০১ সালে বাংলাদেশের ফাস্ট বোলারদের সহায়তায় বোলিং কোচের দায়িত্ব পান। এরপর তিনি পুণরায় ২০০৫ সালে বাংলাদেশ দলকে সহায়তা করেছিলেন,এখান থেকেই মাশরাফির সাথে তার সখ্যতা গড়ে ওঠে।মাশরাফিকে স্নেহ করতেন খুব।মুলত বলা চলে যে,আজ এত বছর যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছেন মাশরাফি, তার পেছনে সম্ভবত রবার্টসের অবদানই সবচেয়ে বেশি।বাংলাদেশ অধিনায়কের অলিখিত বোলিং-গুরু।বর্তমান সময়ে মাশরাফির বোলিং ঠিকমত কাজ করছে না,ফিরতে পারছেন না আপন ছন্দে।তাই তার গুরু হিসেবে তাকে পরামর্শ দেবার জন্য ফোন দেন তাকে।প্রথমে বুঝতে পারেননি মাশরাফি।
তাই শুরুতে,’স্যরি স্যার, বুঝতে পারিনি এটা আপনার নম্বর’, বলে অ্যান্ডি রবার্টসের সঙ্গে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন।


সে ঘটনার বিস্তারিত পরে জানানো যাবে। বিশ্বকাপের মাঠে প্রিয় ’কৌশিকে’র বোলিং ঠিকঠাক হচ্ছে না আর এ নিয়ে বেশ কথা-টথাও হচ্ছে। তাই দূর থেকে বারবার কল করেছেন। কিন্তু অচেনা নম্বর দেখে ফোন ধরেননি মাশরাফি, ’আমার নম্বর উনি কিভাবে জোগাড় করেছেন জানি না। আমিও উনার নম্বর জানতাম না। তাই ফোন ধরিনি। পরে টেক্সট দেখে বুঝেছি স্যার কল করেছিলেন।’ বুঝতে পারার পর আর দেরি করেননি মাশরাফি, "ফোন করে বললাম, ’স্যরি স্যার, বুঝতে পারিনি এটা আপনার নম্বর।’ স্যার বললেন, ’ওভারের চারটি বল ঠিকই করছ। কিন্তু দুটি মারার বল দিচ্ছ। ওরা মেরে দিচ্ছে। আর এ যুগে চারটি ভালো বল থেকেও অন্তত সিঙ্গেল নিয়ে নেয় ব্যাটসম্যান। তোমার সমস্যা হচ্ছে ওই দুই বল।" বাংলাদেশ অধিনায়কই জানালেন, ’স্যার ইংল্যান্ডে আসতে পারেন। এলে দেখা হবে।’

দেখা হলে কথাও হবে। তবে অ্যান্ডি রবার্টসের সঙ্গে ফোনে কয়েক মিনিটের কথাই কেমন টনিক হয়ে জাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ অধিনায়ককে, ’স্যারকে বলেছি, আমার একটু সমস্যা হচ্ছে। উনি ওটা সারিয়ে নিতে বলেছেন।’ সেই সমস্যার সূত্রপাত তাঁর চোটজর্জর শরীর। হ্যামস্ট্রিংয়ের ইনজুরি গত পরশু ফিল্ডিং প্র্যাকটিসের সময় নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। তবু কাল স্পট বোলিং করেছেন মাশরাফি। সেই কবে থেকেই তো তাঁর ক্রিকেট-জীবন এমনই, ’ব্যথা তো সব সময়ই থাকে। আমার এই বয়সে একজন পেস বোলারকে ব্যথা নিয়েই খেলতে হবে। আমি তো আর নতুন না, ১৮ বছর হয়ে গেল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছি।’

বাংলাদেশ দলের অধিনায়কই শুধু নন তিনি, বয়োজ্যেষ্ঠ ক্রিকেটারও। হাঁটুতে সাতটি অস্ত্রোপচার করিয়ে খেলা এ মানুষটির এবারের বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শুনে তীব্র হতাশাই ব্যক্ত করেছেন তামিম ইকবাল, ’কারা এগুলো বলে? বিদেশি যেসব ক্রিকেটারের কথা বললেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁদের পারফরম্যান্স কী? আমি আসলে অন্যদের কথা নিয়ে ভাবছি না। তবে দেশের মানুষের কিছু বলার আগে ভাবা উচিত মাশরাফি ভাই দেশের জন্য কী করেছেন। উনাকে আনফিট বলছেন? যদি তা-ই হয়, আমি তো বলব উনি ১০-১৫ বছর ধরেই আনফিট! আমি মনে করি উনি যেটুকু শ্রদ্ধা পাচ্ছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রাপ্য উনার। উনাকে নিয়ে কিছু বলার আগে অনুরোধ করব যেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য উনার অবদানের কথা একবার ভাবা হয়। আরেকটি কথা, সব আসরে সব ক্রিকেটার ভালো করে না। চ্যাম্পিয়ন দলেরও সবাই পারফরম করে না। আমি মনে করি, সমালোচনা করাটা উনার প্রতি আনফেয়ার করা হবে।’

জাতীয় দলের ম্যানেজার খালেদ মাহমুদও হতবাক মাশরাফির তিন ম্যাচের নৈপুণ্য নিয়ে কথা ওঠায়, ’কার সমালোচনা আমরা করছি? যে কিনা দলের সফলতম বোলারদের একজন! ইংল্যান্ড ম্যাচে ওর বোলিং নিয়ে কথা উঠেছে। কিন্তু ৩৮৬ রান ওঠা ম্যাচে মাশরাফি কত রান দিয়েছে? আরে, ও তো আর ১০০ রান দেয়নি। আর দিলেই কী? এক ম্যাচে একালে যেকোনো বোলারই রান দিতে পারে। এখন তো ভালো বলেও ব্যাটসম্যান বাউন্ডারি মেরে দেয়। তা ছাড়া ক্রিকেট এত সোজা যে আপনি প্রতি ম্যাচে একইভাবে পারফরম করবেন?’

মাশরাফি অতটা আবেগাক্রান্ত নন চারপাশ থেকে সমালোচনার বুদ্বুদ উঠতে দেখে, ’আমি সোশ্যাল মিডিয়া দেখি, তবে প্রতিক্রিয়া হয় না। সেটা সাফল্য বলুন কিংবা ব্যর্থতা। আর মানুষ তো বলবেই। আমি শুধু জানি আমাকে কী করতে হবে।’

কী করতে হবে, সে তো আর এত দিনের অভিজ্ঞতায় অজানা নয় মাশরাফি বিন মর্তুজার। বলের গতি আর আগের মতো নেই। লাইন, লেংথ, গতি-বৈচিত্র্য আর কাটার তাঁর অস্ত্র। গতি একটু কম হওয়ায় কোনো কোনো ব্যাটসম্যান সামনে বেরিয়ে খেলে দিচ্ছেন মাশরাফিকে। তাই লেংথটা একটু অ্যাডজাস্ট করায় ব্যস্ত তিনি কোর্টনি ওয়ালশের সামনে, যাঁকে আজন্ম আদর্শ মানেন। আর ফোনে শুনেছেন কৈশোরের অনুপ্রেরণাদায়ী মানুষটির অভয়বাণী।

হাজার মাইল দূরের অ্যান্টি রবার্টস সেই একুশ শতকের শুরু থেকেই মাশরাফির অনুপ্রেরণা। বিকেএসপির ক্যাম্পে মন বসছিল না বরাবরের হোমসিক কৌশিকের। সেকালে এ নামেই পরিচিত ছিলেন আজকের মাশরাফি। তো, একদিন কাউকে না বলে ক্যাম্প ছেড়ে এসে ওঠেন মিরপুরে এক চাচার বাসায়। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছিলেন যে আর যাবেন না ক্যাম্পে, নড়াইলই গন্তব্য। কিন্তু একদিন মিরপুরের সেই বাড়ির নিচে একটি গাড়ি এসে দাঁড়ায়। খবর পেয়ে লুঙ্গি পরা মাশরাফি গিয়ে দেখেন ওই ক্যাম্পের বোলিং উপদেষ্টা রবার্টস, ’কৌশিক, তুমি জানো না কী ভুল করছ। কাল ক্যাম্পে ফিরবে।’ সে বলায় এমন আন্তরিকতা আর আশীর্বাদের ছোঁয়া ছিল যে সেদিনের কৌশিক ফিরে গিয়েছিলেন বিকেএসপির ক্যাম্পে।

প্রসঙ্গত,বাংলাদেশ দল এখন বিশ্বকাপ খেলতে ইংল্যন্ডে।সাউথ আফ্রিকাকে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হারিয়ে উড়ন্ত সুচনা করলেও পরে ছন্দপতন ঘটে মাশরাফির দলের।নিউজিল্যান্ড,ইংল্যান্ডের কাছে হেরে টেবিলের অনকেটাই তলানিতে বাংলাদেশের অবস্থান।তাই মাশরাফিকে উজ্জিবিত করতেই মুলত অ্যান্ডি রবার্টসের ফোন, হয়ত এতে কিছুটা হলেও অনুপ্রানিত হবে মাশরাফি।