অর্থনীতিতে দিন দিন তরতর করে উপরে উঠে আসছে বাংলাদেশ। প্রতিনিয়তই বাংলাদেশ উন্নয়নের ধাপ অতিক্রম করছে একে একে। আর সেই পথে এবারে আরো একধাপ এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ছাড়িয়ে গেছে বন্ধু দেশ ভারতকেও। আর এ সব নিয়েই একটি লেখনি লিখেছেন ভারতের এক সাংবাদিক।ত্রিদিবেশ সিং মাইনি।২০২০-২০২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে শতকরা ৯ ভাগ। মাথাপিছু আয় ধরা হয়েছে ২২২৭ ডলার। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ভারতের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। ভারতে মাথাপিছু আয় ১৯৪৭ ডলার। বাংলাদেশে প্রত্যাশার চেয়ে উচ্চ মাত্রায় রেমিটেন্স আসার ফলে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে জাতীয় প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) পর্যালোচনা করেছে বিশ্বব্যাংক। আগে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস করা হয়েছিল শতকরা ১.৭ ভাগ। তা পর্যালোচনায় ধরা হয়েছে শতকরা ৩.৬ ভাগ। কয়েক বছরে বাংলাদেশ নক্ষত্রের মতো জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যক্ষ করেছে। ২০১৯ সালে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে শতকরা ৮.৪ ভাগ।
শ্রীলঙ্কা ও ভারতকে বাংলাদেশের সহায়তা: প্রতীকী অর্থে গুরুত্বপূর্ণ

সাম্প্রতিক দুটি উন্নয়ন এটাই পুনরায় বলে দিয়েছে যে, ঢাকা এমন বার্তা দিতে চাইছে- অর্থনৈতিক উত্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নয় ঢাকা। কিন্তু তারা দক্ষিণ এশিয়ায় সার্বিক উন্নয়নের একটি বার্তা দিতে চায়। প্রথমত, তিন মাস সময়ের জন্য শ্রীলঙ্কাকে ২০ কোটি ডলার অর্থ দিতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। ২০২০ সালে চীনের কাছ থেকে সহায়তা নিয়েছে শ্রীলঙ্কা। এর মধ্যে রয়েছে ১০০ কোটি ডলার ঋণ, ১৫০ কোটি ডলার মুদ্রা বিনিময়। ২০২০ সালে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কাকে ৪০ কোটি ডলার ঋণ বৃদ্ধি করেছে ভারত।

এখানে এটা পয়েন্ট-আউট করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যে ভারতকে সহায়তা দিয়েছে যে ৪০টি দেশ তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। করোনা মহামারির দ্বিতীয় এ ঢেউয়ের সময় যখন সংক্রমণ পিক-এ পৌঁছে তখন ভারতকে এ রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ১০ হাজার রেমডিসিভির দিয়েছে বাংলাদেশ। রেমডেসিভির ছাড়াও ভারতকে পিপিই কিট, জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি এবং অন্যান্য ট্যাবলেট দিয়েছে বাংলাদেশ।

মাত্রার দিক দিয়ে শ্রীলঙ্কাকে দেয়া বাংলাদেশের সহায়তা উল্লেখযোগ্য নাও হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে এ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়া হচ্ছে যে, এ অঞ্চলে এবং এর বাইরে বাংলাদেশ আর ভারতের ছায়ার নিচে নেই। এপ্রিলের শেষে বাংলাদেশের মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৫৬০০ কোটি ডলার। একইভাবে করোনা মহামারিকালে ভারতকে দেয়া ঢাকার সহায়তাকে প্রতীকী অর্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে চায় বাংলাদেশ

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে তার সম্পর্ক শক্তিশালী করার একটি ক্ষেত্র দিয়েছে। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং-এর মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া- এটাই দেখিয়ে দেয় যে, আন্তরিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি, তারা চীনকে সমীহ করে চলবে বলে মনে হয় না। গত মাসে বাংলাদেশে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস এসোসিয়েশনের সদস্যদের সামনে এক ভার্চ্যুয়াল বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, বাংলাদেশ যদি কোয়াডে যোগ দেয় তাহলে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেছেন, এই চার সদস্যের ছোট্ট ক্লাবে বাংলাদেশের অংশ নেয়া স্পষ্টত একটি ভাল আইডিয়া নয়। কারণ, এতে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চীনা এই কূটনীতিকের এমন মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন। তিনি বলেছেন, একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে দেশের জনগণের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যে শক্তিশালী হয়েছে, এ নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। ২০২১ সাল নাগাদ উভয় দেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৮০০ কোটি ডলার নির্ধারণ করেছে। ২০১৬ সালে এই দুটি দেশ তাদের মধ্যকার সম্পর্ককে কৌশলগত একটি সম্পর্কে পরিবর্তন করে, যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশের অবকাঠামোখাতে বড় অংকের বিনিযোগ করছে চীন। এখানে শীর্ষ স্থানীয় উন্নয়ন অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে চীন।

একই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উত্থান হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলো বাংলাদেশ। ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে এই দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য হয়েছে ৯৪৫ কোটি ডলার। বাণিজ্যিক উদ্যোগ ছাড়াও রেল, নৌ এবং সড়কপথে সংযুক্তি বা কানেক্টিভিটি বাড়ানো হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও বাংলাদেশের দৃষ্টি

প্রকৃত সত্য থেকে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়, যেমন ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশনে বাংলাদেশকে যুক্ত করার কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার কড়াভাবে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যা দিয়েছিলেন। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনকে ফোন করে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেনের সঙ্গে কথা বলে এবং বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে ভাল লাগছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যকার স্থায়ী শক্তিশালী সম্পর্কের বিষয়ে নিশ্চয়তা দিচ্ছি। দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের চ্যালেঞ্জগুলো একসঙ্গে মোকাবিলা করতে চাই।

অন্যদিকে কোয়াডের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগ দেয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিকে একজন গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার ধারণায় মোটেও সন্তুষ্ট নয় বেইজিং। চীনকে যখন ঢাকা অবজ্ঞা করতে পারে না, তখন একই সময়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে তাদের কৌশলগত অবস্থান বৃদ্ধি করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পরিষ্কারভাবে কিছু পয়েন্টের পুনরুল্লেখ করে। প্রথমত, এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে। দ্বিতীয়ত, যখন বাংলাদেশের মতো দেশগুলো অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ হবে, তারা ভূরাজনৈতিক জটিলতা আরো উন্নতভাবে মোকাবিলা করতে পারবে। এক্ষেত্রে তাদেরকে দুটি পছন্দ বেছে নিতে বাধ্য করা যাবে না। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে নিজের প্রতিবেশীদের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভারতের যেমন অংশীদারিত্ব আছে, তা কোনো শর্তের ভিত্তিতে বা এ অঞ্চলে চীনের অগ্রবর্তীতার প্রতিক্রিয়ায় হওয়া উচিত নয়।

শেষকথা

এই লেখার শুরুতে সাম্প্রতিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তা শুধু দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে নয়, বিশ্বের প্রেক্ষাপটেও। এ অঞ্চলে প্রতিবেশী অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয় অনুকরণ করতে পারে। এতে এ বিষয়টিই নিশ্চিত হবে যে, কোনো দেশই তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না, তাদের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নির্দেশনা দিতে পারে না।


এবারের বাজেটে বাংলাদেশ আগে থেকে এগিয়ে গেছে অনেকখানি। তবে প্রতিবারের মত এই বাজেট নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে এবারের বাজেট নিয়ে বেশ কিছু দিন তুলে ধরেছেন সিইসি। বিশেষ করে বাজেটে বেশ কিছু দিক নিয়ে নতুন করে পুর্নবিবেচনা করতে বলেছেন সিইসি।