সম্প্রতি সংসদের এক অধিবেশনে সবার তোপের মুখে পড়েন দেশের বর্তমান স্বাস্থমন্ত্রী। আর এ নিয়েই এখন চারিদিকে চলছে তুমুল আলোচনা সমালোচনা। জানা যায়, স্বা’স্থ্যখাতের নানা অনিয়ম, দু’র্নীতি এবং প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হে’নস্তার ঘটনায় সং’সদে তোপের মুখে পড়েছেন স্বা’স্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তবে এ নিয়ে তিনি কোনো কথা বলেননি। এসব প্রসঙ্গ এড়িয়ে ক’রোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ সফলতা দেখিয়েছে দাবি করে মন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে। সোমবার (৭ জুন) জাতীয় সং’সদে ২০২০-২১ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ও’পর আলোচনায় ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ও’পর আলোচনায় অংশ নিয়ে ক্ষো’ভ প্রকাশ করেন সং’সদ সদস্যরা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও সং’সদে বি’রোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের বলেন, ’যারা পুকুর চু’রি করছেন, তারা বেরিয়ে যাচ্ছেন। যারা এসব প্রকাশ করছেন, তারা নানা স’মস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জবাবদিহি নিশ্চিতে কাজ করে। সাংবাদিকদের এটুকু সুযোগ দেওয়া সমাজের দায়িত্ব।’ তিনি আরও বলেন, ’প্রস্তাবিত বাজেটে স্বা’স্থ্যখাতে বরাদ্দ জি’ডিপির শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। এটা ৪ থেকে ৫ শতাংশ দেওয়া উচিত ছিল। ক’রোনা ম’হামা’রির কারণে বাড়ানো উচিত ছিল। কমপক্ষে জি’ডিপির ২ শতাংশ উচিত। ক’রোনা নিয়ন্ত্রণে এলে অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। তাই স্বা’স্থ্যের দিকে খেয়াল করতে হবে। এটাকে অবহেলা করা উচিত নয়। কিন্তু অবহেলা করা হচ্ছে।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সং’সদ সদস্য হারুন অর রশীদ বলেন, ’স্বা’স্থ্য ম’ন্ত্রণালয়কে ঢেলে সাজাতে হবে। এটা সংস্কার করত হবে। বাংলাদেশের স্বা’স্থ্য ম’ন্ত্রণালয় দু’র্নীতির ডিপো। এই দু’র্নীতি কীভাবে সংস্কার করবেন, এ ব্যাপারে আমাদের সুস্পষ্টভাবে জানাবেন স্বা’স্থ্যমন্ত্রী।’ তিনি বলেন, ’স্বা’স্থ্য বিভাগ সত্যিকারভাবে আজ ভারতনির্ভর হয়ে গেছে। এতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ভারতে চলে যাচ্ছে। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে স্বা’স্থ্য বিভাগকে ঢেলে সাজাতে পারি, সংস্কার করতে পারি তাহলে বিদেশে স্বা’স্থ্যখাতে যে ব্যাপক টাকা চলে যায়, তা যাবে না।’

হারুন আরও বলেন, ’মানসম্মতভাবে স’রকারের নিয়ন্ত্রণে যদি টিকা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা আগামী এক বছরের মধ্যে ৮০ শতাংশ লোককে টিকার আওতায় আনতে পারব। আমি মনে করি স’রকারের পাশাপাশি এখানে বেস’রকারি ব্যবস্থাকে উন্মুক্ত করতে হবে। সেখানে দু’র্নীতি থাকা চলবে না। স্বা’স্থ্যখাতে কেনাকা’টায় সবকিছু সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাই।’ বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সং’সদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহা’না বলেন, ’ক’রোনাকাল হওয়া সত্ত্বেও এ বছর আমরা স্বা’স্থ্য ও শিক্ষার মতো বেসিক জিনিসগুলোর ও’পর যদি নজর না দেই, ভৌত অবকাঠামোর দিকে যদি আমরা সারাদিন তাকিয়ে থাকি, তাহলে ক’রোনা বলেন আর যাই বলেন দেশের সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হবে না। ১০ হাজার মানুষের মাথাপিছু ডাক্তার আছে মাত্র পাঁচজন। আর নার্স আছে মাত্র তিনজন। এই অপ্রতুল জনগণ নিয়ে কীভাবে হাসপাতালগুলো চলবে? কীভাবে আমরা স্বা’স্থ্যখাতকে ঢেলে সাজাবো? কীভাবে আমরা সাধারণ মানুষকে সেবা দেবো?’

জাতীয় পার্টির রওশন আরা মান্নান বলেন, ’স্বা’স্থ্যখাতে নজর দিলে দেখা যাবে, এখানে অস্বা’স্থ্যকর কাজকর্মই বেশি। স্বা’স্থ্যখাতের আফজালরা নতুন রূপকথার মতো গল্প ও অনিয়ম করছে। যদিও বর্তমানে স্বা’স্থ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে কিছুটা কমে আসছে। কিন্তু তারপরও থামানো যাচ্ছে না। স্বা’স্থ্য অধিদপ্তরের লোকজন বলছেন স্বা’স্থ্যখাতে আফজাল-মালেকরা ছাড়াও সেখানে অনেক মালেক ও আফজাল আছে। এগুলো শক্ত হাতে দ’মন করতে হবে। একজন নারী উপস’চিবের কানাডা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে তিন-চারটা বাড়ি আছে।’

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হে’নস্তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ’একজন নারী সাংবাদিক যদি অন্যায় করে থাকেন, তাহলে তাকে পুলিশে দিলো না কেন? তাকে ৬ ঘণ্টা নি’র্যাতন করে কেন পুলিশে দেওয়া হলো? আইন কেন নিজ হাতে তুলে নিল? দেশবাসী এটা নিয়ে অনেক বেশি সমালোচনা করছে।’ একই দলের কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ’আমাদের অক্সিজেন নেই, অক্সিজেন প্ল্যান্ট জেনারেট করতে হবে। সাংবাদিক রোজিনার নাম না নিয়ে তিনি বলেন, সে যদি চু’রি-ডাকাতি করে, সাংবাদিককে গ্রে’ফতার করতে পারেন, তাকে পুলিশে দেবেন—এটাই নিয়ম।

আইন নিজের হাতে কেন তুলে নেবেন? আপনিতো স’চিবালয়ের বড় কর্মকর্তা। আপনি কেন নিজের হাতে আইন তুলে নিলেন? আপনি সাংবাদিককে নাস্তানাবুদ করলেন কেন? ছয় ঘণ্টা তাকে টয়লেটে যেতে দেননি। একজন অ’সুস্থ মানুষ। তাও নারী। তাকে এভাবে হে’নস্তা করলেন! এ নিয়ে জাতিসংঘ কথা বলল। সারাবিশ্ব কথা বলল। আমাদের মুখটা কোথায় রইল? নিজেদের দুর্বলতা নিজেদের ঢাকতে হয়। ওখানে যদি তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিতেন, যে আপনি আর জীবনে কখনো স’চিবালয় ঢুকতে পারবেন না, এটা পৃথিবীর আর কেউ জানত না।

এটা না করে আপনারা এমনভাবে জাহির করলেন, এখন আপনাদের যত যা আছে দুর্বলতা প্রতিদিন প্রকাশ পাচ্ছে। সামনে আমরা মহাবি’পদ দেখছি। এভাবে বি’পদ থেকে কীভাবে রক্ষা পাব, এখন থেকে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তবে সং’সদ সদস্যদের এসব প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি স্বা’স্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, ’স্বা’স্থ্যসেবা একটি ব্যাপক কর্মযজ্ঞ। দেড় বছর ধরে ক’রোনা চলছে। তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’ ক’রোনা মোকাবেলায় স’রকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে স্বা’স্থ্যমন্ত্রী বলেন, ’ও’ষুধের কোনো ঘাটতি হয়নি। অক্সিজেনের অভাব কখনোই হয়নি। আমেরিকায় যে চিকিৎসা এখানেও একই চিকিৎসা হয়েছে। ভ্যাকসিন কার্যক্রম চলমান আছে। এসব কারণে মৃ’ত্যুর হার দেড় শতাংশ। বিশ্বে এই হার আড়াই শতাংশ।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ’ভারতে ক’রোনা বেড়ে যাওয়ায় সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা সরবরাহ করতে পারছে না। চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে টিকা নিয়ে চুক্তিও হয়েছে। আরও অনেক ভ্যাকসিন কিনতে হবে। প্রতিটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে টিকার জন্য প্রায় তিন হাজার টাকা করে লাগবে। ক’রোনার সময়ও প্রতিটি ব্যক্তির জন্য সাধারণ শয্যায় চিকিৎসা নিতে ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এটা স’রকার বহন করেছে। যারা আইসিইউতে ছিলেন তাদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে খরচ করেছে। ক’রোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ খুবই সফলতা দেখিয়েছে। এ কারণে দেশের মানুষের জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক।’

গেল কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে সব থেকে বেশি আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে সরকারি এই স্বাস্থমন্ত্রলনায়। দীর্ঘদিন ধরেই এই প্রতিষ্ঠানটিতে চলছে নানা ধরনের অনিয়ম আর দুর্নিতী। আস্থা হারিয়ে ফেলেছে জনগন। তবে এখনো এ নিয়ে সরকার থেকে কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়নি।